উপন্যাসে, গল্পে, আমি সবসময় লিখতে চেয়েছি, আমার বাস্তবতা, যেটা সম্পর্কে আমি সবচেয়ে কম জানি অথবা কিছুই জানি না। আমার নিজের এবং আমার বাস্তবতার ভেতরে খোঁদল করতে করতে আমাকে ঢুকতেই হত এই গহ্বরে, যেটা অনেকটা একটা আদিম গুহা বা সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ার মতোই, যেখানে ঢোকার পর কী হবে তা আমি কখনওই আগে থেকে জানি না, এর কোনও পূর্বানুমান নেই। হ্যাঁ, বিষয়টা একই সঙ্গে উত্তেজনার এবং একই সঙ্গে বিষণ্ণতার, চমকপ্রদ এবং একঘেয়ে, একইসঙ্গে।

এখন যে উপন্যাসটা নিয়ে কাজ করছি, এটা অনেকটা কালো রঙের রূপকথা। আমি জানি না এই জগৎ কী করে আমার কাছে আসছে, বা এসবের মধ্যে দিয়ে সে আসলে কী বলতে চাইছে। ব্যাপারটা কবিতা লেখার মতোই অনেকখানি, যখন কবি জানেন না পরের লাইনে তিনি কী লিখবেন। আমার বরাবরের যেটা স্বভাব, ক্ষেত্র নয়, আত্মসমীক্ষা। বাংলা সাহিত্যের পারিবারিক সদস্যদের ধারা মেনে অনেক বন-জঙ্গল-নদী-পর্বত-গ্রাম-আদিম জনজাতিদের মধ্যে ঘুরে অথবা নস্টালজিয়া খোঁড়াখুঁড়ি করে বিস্তর গবেষণা সন্দর্ভের মতো উপন্যাস উৎপাদন, এসব বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, আমার নয়। এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। আমাকে সমীক্ষা চালাতে হয় নিজের ভেতরে। খোঁড়াখুঁড়ি যা কিছু নিজের বাস্তবতার জঙ্গলে। আটটি উপন্যাস এভাবেই। পঞ্চাশটি গল্প অন্ততঃ, এ পথেই। আখ্যানটি বলার জন্য আমার কোনও রীতি নেই৷ প্রত্যেকটির জন্য প্রয়োজনীয় গদ্যশৈলী খুঁজতে আমাকে বসে থাকতে হয়, হাতড়াতে হয়, অন্ধকারে। এছাড়া কোনও উপায় আমার জানা নেই। পুরোটা লেখার সময়কালে, লেখাটার সঙ্গে আমার এত ধ্বস্তাধস্তি চলে যে, আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত, নিঃশেষিত হয়ে যাই পুরো। সম্পূর্ণ ছিবড়ে। তারপর আবার নিজেকে তুলে আরেকটা আখ্যানের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং ফের একইরকম ধ্বস্তাধস্তি, শরীর-মন-মাথার ভেতর দিয়ে অসম্ভব ঝড়, বয়ে যায়। এই যুদ্ধটা প্রচণ্ড অবসাদগ্রস্ত করে তোলে নিজেকে। সংশয়ে কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত অবস্থা। তখন মনে হয়, সত্যিই মনে হয়, আর নয়। আমার তো নিজেকে, নিজের মনকে ভালো রাখারও দায়িত্ব রয়েছে। লিখছি কেন তবে? লিখনে কী ঘটে?
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
৯ই মে, ২০২৪