অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

I write to understand what remains after everything leaves

আত্নকথন

উপন্যাসে, গল্পে, আমি সবসময় লিখতে চেয়েছি, আমার বাস্তবতা, যেটা সম্পর্কে আমি সবচেয়ে কম জানি অথবা কিছুই জানি না। আমার নিজের এবং আমার বাস্তবতার ভেতরে খোঁদল করতে করতে আমাকে ঢুকতেই হত এই গহ্বরে, যেটা অনেকটা একটা আদিম গুহা বা সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ার মতোই, যেখানে ঢোকার পর কী হবে তা আমি কখনওই আগে থেকে জানি না, এর কোনও পূর্বানুমান নেই। হ্যাঁ, বিষয়টা একই সঙ্গে উত্তেজনার এবং একই সঙ্গে বিষণ্ণতার, চমকপ্রদ এবং একঘেয়ে, একইসঙ্গে।

এখন যে উপন্যাসটা নিয়ে কাজ করছি, এটা অনেকটা কালো রঙের রূপকথা। আমি জানি না এই জগৎ কী করে আমার কাছে আসছে, বা এসবের মধ্যে দিয়ে সে আসলে কী বলতে চাইছে। ব্যাপারটা কবিতা লেখার মতোই অনেকখানি, যখন কবি জানেন না পরের লাইনে তিনি কী লিখবেন। আমার বরাবরের যেটা স্বভাব, ক্ষেত্র নয়, আত্মসমীক্ষা। বাংলা সাহিত্যের পারিবারিক সদস্যদের ধারা মেনে অনেক বন-জঙ্গল-নদী-পর্বত-গ্রাম-আদিম জনজাতিদের মধ্যে ঘুরে অথবা নস্টালজিয়া খোঁড়াখুঁড়ি করে বিস্তর গবেষণা সন্দর্ভের মতো উপন্যাস উৎপাদন, এসব বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, আমার নয়। এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। আমাকে সমীক্ষা চালাতে হয় নিজের ভেতরে। খোঁড়াখুঁড়ি যা কিছু নিজের বাস্তবতার জঙ্গলে। আটটি উপন্যাস এভাবেই। পঞ্চাশটি গল্প অন্ততঃ, এ পথেই। আখ্যানটি বলার জন্য আমার কোনও রীতি নেই৷ প্রত্যেকটির জন্য প্রয়োজনীয় গদ্যশৈলী খুঁজতে আমাকে বসে থাকতে হয়, হাতড়াতে হয়, অন্ধকারে। এছাড়া কোনও উপায় আমার জানা নেই। পুরোটা লেখার সময়কালে, লেখাটার সঙ্গে আমার এত ধ্বস্তাধস্তি চলে যে, আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত, নিঃশেষিত হয়ে যাই পুরো। সম্পূর্ণ ছিবড়ে। তারপর আবার নিজেকে তুলে আরেকটা আখ্যানের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং ফের একইরকম ধ্বস্তাধস্তি, শরীর-মন-মাথার ভেতর দিয়ে অসম্ভব ঝড়, বয়ে যায়। এই যুদ্ধটা প্রচণ্ড অবসাদগ্রস্ত করে তোলে নিজেকে। সংশয়ে কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত অবস্থা। তখন মনে হয়, সত্যিই মনে হয়, আর নয়। আমার তো নিজেকে, নিজের মনকে ভালো রাখারও দায়িত্ব রয়েছে। লিখছি কেন তবে? লিখনে কী ঘটে?

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
৯ই মে, ২০২৪

উপন্যাস ভারতীয় নোটবুক

‘ভারতীয় নোটবুক’ পড়ে লেখক মৃণাল শতপথী-র প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। কয়েকদিন আগে রাতের দিকে মৃণাল ফোন করেছিলেন। যদিও তাঁর মতে ‘এখানে (টেলিফোনে) সেভাবে আলোচনা হয়নি’ এবং ‘এই আলোচনা অসংলগ্ন’। তবু আমি এই আলোচনা প্রকাশ্যে আনলাম, কারণ সভ্যতার বায়ুদূষণের মতো এই অসংলগ্নতাও অমোঘ।

বসন্তসেনা

ভাষা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জগতের নিয়মতন্ত্রে শুধু একটি মাধ্যম নয়—তা ক্ষমতারও একটি কাঠামো। তা ক্ষমতার প্রযুক্তি। আধুনিক রাষ্ট্র এই সত্যটি খুব ভালো বোঝে। তাই আজ ভাষা মানে কেবল শব্দ বা বাক্য নয়; ভাষা মানে ডেটা, কোড, ক্যাটাগরি। কে কী বলছে, কখন বলছে, কোথায় বলছে—এই সবই নজরদারির কাঠামোর ভেতরে পড়ে।
আমরা যে বাস্তবকে দেখি, বুঝি, গ্রহণ করি বা প্রত্যাখ্যান করি, সেই পুরো প্রক্রিয়াটাই ভাষার ভেতর দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। ভাষা তাই নিরপেক্ষ নয়। ভাষা সিদ্ধান্ত নেয় কোনটা দৃশ্যমান হবে, কোনটা অদৃশ্য থাকবে; কোন অনুভব বৈধ, কোনটা অপ্রয়োজনীয়। ফলে ভাষার স্ট্রাকচারকে প্রশ্ন করা মানে কেবল দর্শনের অনুশীলন নয়—তা রাজনীতির একেবারে কেন্দ্রে গিয়ে দাঁড়ানো।

প্রসঙ্গ: মার্ক্সের মৃত্যু – একটি নতুন গল্প

নতুন গল্পটি লিখতে বসার মুহূর্তে আমি জানতাম না আমি একটি আখ্যান লিখতে যাচ্ছি, নাকি একটি ভূত-রিপোর্ট, নাকি নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছি। ‘মার্ক্সের মৃত্যু’—শিরোনামটি প্রথমে এসেছিল কবি হিন্দোল ভট্টাচার্যের কথায়, একটি তারিখের ভিতর থেকে। ১৪ই মার্চ। মার্ক্সের মৃত্যুদিন। একই দিন নন্দীগ্রামের রক্তস্মৃতি। সেই তারিখের ভেতরে যেন ইতিহাসের দুটি আলাদা শিরা স্পন্দিত হচ্ছিল। আমি গল্প লিখতে বসিনি; আমি একটি তারিখের ভেতরে ঢুকতে বসেছিলাম।

টানা ছ-সাত ঘণ্টা। এক বৈঠকে। আড়াই হাজার শব্দ। এই ফর্মে আগে লিখিনি। পঁচিশ বছরে সত্তরটিরও বেশি গল্প লিখেছি—কিন্তু সেখানে আখ্যানের একটা দৃশ্যমান কঙ্কাল থাকত। এখানে লিখতে বসেই বুঝলাম, কঙ্কালটি সরিয়ে ফেলতে হবে। যেন ভাষা নিজেই নিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, অথচ যেকোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।

আত্মকথন (৬)

একটা উৎকৃষ্ট গদ্য লিখনকালীন যে তৃপ্তি—তার তুলনা খুঁজতে গিয়ে মানুষ শরীরের দিকে তাকায়। আমি তাকাই ভাষার দিকে। শরীরের চূড়ান্ত মুহূর্তে যে বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে, তা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু বাক্যের ভিতর যে আগুন ধীরে ধীরে পাকে, তা দীর্ঘস্থায়ী, তা পুনর্গঠিত হয়, তা ফিরে আসে স্মৃতির ভেতর, পুনরায় পাঠে, পুনরায় উচ্চারণে।

যৌনসুখ একটি বিস্ফোরণ। লেখা একটি নির্মাণ। বিস্ফোরণ শেষে দেহ ক্লান্ত হয়; নির্মাণ শেষে মন স্থির হয়। দেহের তৃপ্তি এক প্রকার অবসান—লেখার তৃপ্তি এক প্রকার সূচনা। একটি গদ্য যখন নিজের ছন্দে দাঁড়িয়ে যায়, যখন একটি বাক্য আরেকটি বাক্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয় যেন তাদের আলাদা করা যায় না, তখন মনে হয় আমি কেবল লিখিনি—আমি এক প্রকার অস্তিত্ব নির্মাণ করেছি।

আত্মকথন (৫)

হোয়াটসঅ্যাপে স্টেটাস দিয়েছিলাম তারিখবিহীন এই ডায়েরির পাতা। আমার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র এক ভ্রাতৃপ্রতিম জিগ্যেস করল, কামু এখানে ‘I’-এর পর ‘is’ কেন বলেছিলেন।

আমার উত্তর:

কামুর ‘দ্য ফল’ উপন্যাসের নায়ক ক্লামাঁস বলেন, ‘I, I, I is the refrain of my whole life’… এখানে ‘are’ এর পরিবর্তে ‘is’ ব্যবহারের বিষয়টি একটি সচেতন ব্যাকরণগত সিদ্ধান্ত, যার উদ্দেশ্য একক, আত্মমগ্ন আসক্তির (narcissistic, singular obsession) বিষয়টিকে তুলে ধরা।

আত্মকথন (৪)

আমার নিজের তা কখনও মনে হয় না যে আমি ছবির মানুষ—আঁকার অর্থে তো নয়ই। আমি মূলত লেখামানুষ। শব্দই আমার উপাদান, বাক্যই আমার উপকরণ। আমি ছবি আঁকি না ছবি আঁকার জন্য। আঁকি তখনই, যখন একটি লেখা আমার ভিতরে জট পাকিয়ে বসে থাকে, যখন বাক্যগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যখন পথ হারিয়ে ফেলি। তখন আমি কাগজে দাগ কাটি—রেখা, ছায়া, কিছু অনির্দিষ্ট আকার। যেন লেখার মেজাজটা স্পর্শ করতে পারি। যেন ভাষার আগে যে অন্ধকার, তার মানচিত্র একটু আঁচ করা যায়।

আমি জানি, এটা কোনও আলাদা শিল্পচর্চা নয়। এটা পথ খোঁজার কৌশল। যেমন Coetzee নাকি লেখায় আটকে গেলে কাঠের কাজ করতেন—হাতুড়ি, কাঠ, মাপজোক; শব্দের বদলে বস্তু। যেমন Henry Miller হঠাৎ টেবিল ছেড়ে কেটে পড়তেন—হাঁটতে, ঘুরতে। যেমন মারকেস দরজা-জানলায় রং করতেন—এক ধরনের মনোসংযোগ, যেখানে গল্পের ভেতরের রঙ ধীরে ধীরে বাইরের রঙে মিশে যায়।

Page 5 of 6

© 2026 Arjun Bandyopadhyay. All rights reserved. | Website developed by Sudip Palodhi