ভাষান্তর — অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
My Lost Country by Muzamil Jaleel — hariye jawa swadesh Translated by Arjun Bandyopadhyay
কাশ্মীরি সাংবাদিক মুজামিল জলিল, যিনি গত শতাব্দির নয়ের দশকে বেড়ে উঠেছেন কাশ্মীর উপত্যকার তৃণভূমি আর পাহাড়গুলিতে। স্বাধীনতার প্রত্যয় নিয়ে মরে যেতে দেখেছেন তাঁর বন্ধু, সহপাঠী আর তাঁদের পরিজনদের। যাঁর দেশ বহুকাল হল এক যুদ্ধক্ষেত্র।
‘মাই লস্ট কান্ট্রি’ শিরোনামে জলিল এই গদ্যটি লিখেছিলেন ‘অবজার্ভার’ পত্রিকায় ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০০২ সালে। ওই একই বছর ২৬ মে, ২০০২ তারিখে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকাতেও ‘আই হ্যাভ সিন মাই কান্ট্রি ডাই’ এই শিরোনামে জলিলের অনুরূপ একটি গদ্য প্রকাশিত হয়েছিল। জলিলের এই লেখাটি আমি অনুবাদ করেছিলাম ২০১৬ সালে, সেপ্টেম্বর মাসে। সেই সময়ে বেশ কিছু পত্রিকায় অনুবাদটি প্রকাশিত হয়। এত বছর পরেও এই গদ্যের একটি শব্দেরও প্রয়োজনীয়তা ফুরোয়নি। বরং শহিদ আর নিখোঁজের সংখ্যা সেদিনের চেয়ে বেড়ে গেছে বহুগুণ।

জলিল ওঁর গদ্যটির শেষে কাশ্মীরি কবি আগা শহিদ আলির বই ‘দ্য কান্ট্রি উইদাউট আ পোস্ট অফিস’ থেকে একটি গদ্যকবিতার অংশ রেখেছিলেন। আগা শহিদ আলির ওই অংশটির অনুবাদ আমি করিনি। তবে, ওই গদ্যকবিতারই একটি নির্বাচিত অংশ, যা জলিলের লেখার মূল সুরটিকে ধরিয়ে দেয়, তা আমার অনুবাদের শুরুতে উদ্ধৃতি হিসেবে রাখলাম।
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
বিবেকানন্দ স্ট্রিট, কোচবিহার শহর
শরৎ, ২০২২

হারিয়ে যাওয়া স্বদেশ
খুব বেশিদিন আগে নয়, কেউ একজন আমায় জিগ্যেস করেছিল, আমি ঠিক কী ধরনের নিউজ স্টোরি লিখি। শোক সংবাদ, এটাই মনে এসেছিল তখন। কাশ্মীরে একজন সাংবাদিক হিসেবে গত দশ বছর ধরে আমি আক্ষরিক অর্থেই শোক সংবাদ লিখে যাচ্ছি; যাতে চরিত্র আর জায়গাগুলোই শুধু পালটাচ্ছে, গল্পটা সর্বদাই এক, একই। সেই দুর্দশায় ভরা আর চোখের জলের গল্প।
শেষে, গত বছর (২০০১) অক্টোবর নাগাদ আমি কাশ্মীর ছেড়ে বেরুবার একটা সুযোগ পেলাম, একটু পরিবর্তন চাইছিলাম আমি। সব মানুষেরই যন্ত্রণা আর বেদনার একটা চরম সীমা থাকে। মনে হয়, আমার সীমাটায় আমি চলে এসেছি। আমি পালাতে চাইছিলাম। কিন্তু, এরমধ্যেই কাশ্মীর আবার শিরোনামে চলে এল এবং হাজার মাইল দূরে থাকলেও আমি এর ঠিক মাঝখানটাতে আবার নিজেকে দেখতে পেলাম।
আমার জন্ম কাশ্মীরে। আমি বড় হয়েছি এর আপেলবাগান আর সতেজ সবুজ তৃণভূমিগুলোতে, স্বপ্ন দেখেছি এর স্বচ্ছজলের স্রোতস্বিনীগুলোর তীরে। এখানেই আমার স্কুল, যেখানে খড়ের মাদুরে বসে নামতা মুখস্থ করেছি। স্কুলের পর আমরা বন্ধুরা সবাই বাড়ির দিকে ছুটতাম, ঝটপট ইউনিফর্ম খুলে ঝাঁপ দিতাম নদীর ঠান্ডা জলে। তারপর জলদি চুল শুকিয়ে নিতাম নিজেদের, যাতে বাড়িতে কেউ বুঝতে না পারে আমরা কী করে এসেছি। কখনও, বেশ একটু বেপরোয়া হলে, আমরা সারাদিন স্কুল পালাতাম ক্রিকেট খেলার জন্য।
আমার গ্রাম হিমালয়ের নীচু ঢালটায়। গরম কমে এলে আমরা গবাদি পশুগুলোর জন্য লবণের চাঁই নিয়ে পাহাড়ের উঁচু তৃণভূমিতে পাড়ি দিতাম। ক্যাম্পফায়ারের চারদিকে সবাই বসতাম গোল হয়ে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বাঁশি বাজাতাম। প্রচণ্ড ঠান্ডা আমাদের ছোট্ট গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোকে একটা বড় ঘরে ঠেসেঠুসে গাদাগাদি ক’রে বসিয়ে একটা মস্ত পরিবার বানিয়ে দিত। অনেক রাত অবধি আমরা গল্প শুনতাম। কাপ ভর্তি গরম লবণ চায়ে চুমুক দিতে দিতে গাঁওবুড়ো, যিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে গল্প বলার এই শিল্পটা পেয়েছেন, আমাদের মধ্যে বাহিত করে দিতেন তাঁর গল্পের ফেলে আসা যুগ। তিনি কখনও স্কুলে যাননি কিন্তু শত শত অসামান্য সব গল্প স্মরণে রাখতেন। কাশ্মীরটা ছিল মস্ত এক পার্টির মতো, প্রেম আর জীবনে ভর্তি। আজ, মৃত্যু আর ভয় চেপে বসেছে সবকিছুর ওপর।
’৮৮ সালে যখন প্রথম বোমা ফাটল তখনও আমি কাশ্মীরে। লোকজন ভেবেছিল এটা বোধ হয় ছোটখাটো দুটো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঝামেলা, যদিও সবাই-ই জানত অনেক বছর বাদে রাজনৈতিক অসন্তোষের পাত্রটা আবার তেতে উঠছে। তারপর, ওই বছরই সেপ্টেম্বরে একটা অল্পবয়েসি ছেলে, আজাজ দার, পুলিশের নৃশংস এনকাউন্টারে মারা গেল। ভারতীয় আইনের অধীনে লোকদেখানো গণতন্ত্রের কয়েক যুগের হাস্যকর ধাপ্পাবাজিতে অসন্তুষ্ট একদল কাশ্মীরি তরুণ আবার লড়বে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা স্বপ্ন দেখছে ভারত এবং পাকিস্তান উভয় থেকেই মুক্ত এক স্বাধীন কাশ্মীরের। তবে আজাজ দারই প্রথম কাশ্মীরি যুবক নন যিনি এজন্যে লড়তে গিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর মৃত্যু ছিল বিয়োগান্তক এক যুগের শুরুয়াদ।
বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব ১৯৪৭ থেকেই কাশ্মীরিদের মনে গুরুত্ব পেয়ে এসেছে, যখন দেশভাগের সময় ভারত আর পাকিস্তানের মাঝখানে কাশ্মীর ভাগ হল, আর দুটো দেশই একে পাবার জন্য লড়তে লাগল। কিন্তু চল্লিশ বছরে (১৯৪৭—১৯৮৭) যা হয়নি, সেটাই হল এবারে, যখন বিরোধী মতকে দমন করতে বিধানসভা নির্বাচনে সরকার প্রযোজিত যথেচ্ছ রিগিংয়ের প্রতিক্রিয়ায়, বেশিরভাগ কাশ্মীরি তরুণ ভারতীয় আইনের বিরুদ্ধে বন্দুককেই বেছে নিল।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড কাশ্মীরি জঙ্গি নেতা, সৈয়দ সালাহুদ্দিন, শ্রীনগর থেকে বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিলেন, শুধু তাই নয়, জানা যায়, তিনি বেশ ভালো ব্যবধানে জেতার মুখেও ছিলেন। তারপর যখন পুরো নির্বাচনটাই জোচ্চুরি হয়ে গেল, তিনি শুধু নির্বাচনটাই হারলেন না বরং পুরো ব্যবস্থাটার ওপরে বিশ্বাসটাও হারালেন। ওঁর পোলিং এজেন্ট আর সমর্থকেরা গ্রেপ্তার হল, অত্যাচারিত হল; পরে যারা বেশিরভাগই জঙ্গি হয়ে গেছে।
প্রতিবেশী পাকিস্তান, কাশ্মীরের এক তৃতীয়াংশ যার দখলে, সেও কাশ্মীরে হাওয়া পালটানোর গন্ধ পেল এবং অস্ত্র প্রশিক্ষণ আর একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়াল। ভারতের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা ভিন্নমত আর সশস্ত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়া কয়েকশো তরুণদের মধ্যে হিংসা প্রবেশ করল। কাশ্মীর পালটাচ্ছিল।
আমি সদ্য স্কুলের গন্ডী পেরিয়েছি তখন, একটা কলেজে নামও উঠেছে। আন্দোলনে যোগ দেবার আদর্শ সময়, যখন গোটা জঙ্গি আন্দোলনটাই আমার প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত। রাস্তায়-ঘাটে, ক্লাসরুমে, বাড়িতে — আলোচনার একটাই বিষয়, আন্দোলন। দ্রুত লোকজন রাস্তায় নামতে শুরু করল, বিখ্যাত সুফি দরগার দিকে কিংবা রাষ্ট্রসঙ্ঘের অফিসের দিকে আজাদির স্লোগান দিতে দিতে হাজার হাজার লোকের মিছিল এগিয়ে গেল। এই গণপ্রতিবাদ রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়াল, পরাহত করল কর্তৃপক্ষকে, যারা বিদ্রোহীদের ওপর পালটা জোর খাটাতে শুরু করল। পুলিশের গুলিতে মারা গেল কয়েক ডজন।
আমার অনেক বন্ধু আর সহপাঠী আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করল। একদিন, আমাদের ক্লাসের অর্ধেকই নিখোঁজ হয়ে গেল। তারা কখনও আর স্কুলে ফিরে আসেনি, এবং কেউ তাদের খুঁজতেও যায়নি, কারণ এটা বোঝাই গেছিল।
যদিও জঙ্গি আন্দোলনে যোগ দেবার কারণগুলো মানুষে মানুষে ভিন্ন, কিন্তু বেশিরভাগ কাশ্মীরিই কখনও নিজেদের ভারতের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেননি। যার ফলে তুলনামূলকভাবে সুপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব শেষমেশ একটা পুরোদস্তুর বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহে ফেটে পড়ল।
আমিও চাইছিলাম যোগ দিতে, যদিও জানতাম না ঠিক কেন বা কী এনে দিতে পারে এটা আমাদের। আমাদের অধিকাংশই টীনএজার। যারা গভীরভাবে এর ফলাফলটা নিয়ে ভাবিনি। সম্ভবত বিদ্রোহী ইমেজটা অবচেতনে আমাদের সবাইকেই আকর্ষণ করছিল।
আমিও সেই ভয়ঙ্কর যাত্রাটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, উত্তর কাশ্মীরে আমাদের গ্রাম থেকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দিকে যেতে, যেখানে সব প্রশিক্ষণ শিবিরগুলো রয়েছে। যাওয়ার পথে ঘড়ির কাঁটার মতো সীমান্ত পাহারা দেওয়া ভারতীয় সেনাদের নজর এড়ালেই শুধু চলবে না, লড়তে হবে ভয়ানক ঠান্ডা আর পায়ে হেঁটে তুষারাবৃত হিমালয়ের চূড়া, যা পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, তা পেরুবার কষ্টসাধ্য বাধার সাথেও। আমি সাধারণ কিছু জিনিসপত্র জোগাড় করলাম : একজোড়া ওয়েলিংটন বুট কিনলাম, পলিথিনের একটা জ্যাকেট তৈরি করালাম, আর আমার গরম কাপড়ের ওপর পরার জন্য ট্রাউজার্স। ঠান্ডার কামড় থেকে বাঁচাতে উলের কিছু কাপড় খুঁজে বের করলাম আমার বাছুরগুলোকে তাতে জড়িয়ে নেবার জন্য।
সৌভাগ্যবশত, আমি পারলাম না। তিন-তিনবার আমাদের দলটা সীমান্ত থেকে ফিরে এল। প্রত্যেকবার কিছু না কিছু হল যা আমাদের গাইডকে বাধ্য করল আমাদেরকে ফিরিয়ে আনতে। তৃতীয়বার, আমাদের ২৩ জনের দলটা যাত্রা শুরু করল মালাঙ্গামের নীচ থেকে, আমার গ্রাম থেকে যা খুব একটা দূরে নয়, তবু একটা ঘন জঙ্গলে এখানে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকতে হবে। রাত তখন অনেক, কাছাকাছি গুলির শব্দ শুনে, ভারতীয় সেনার উপস্থিতি টের পেয়ে আমাদের দলটা ছড়িয়ে পড়ল। সকালে, আমরা যখন আবার জড়ো হলাম, আমাদের গাইড তখন নিখোঁজ। অন্যেরা বেশিরভাগই সিদ্ধান্ত নিল নিজেদের ভরসায় এগিয়ে যেতে, কিন্তু আমাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন ফিরে এল। তিন দিন ধরে গাছের পাতা ছাড়া আর কিছু আমাদের খাবার মতো ছিল না। কোনও মানুষ দেখতে পাব এই আশায় আমরা আকাশের উড়ন্ত কাকগুলোকে অনুসরণ করতে লাগলাম। আমি ভাগ্যবান যে ঘরে পৌঁছলাম এবং বেঁচেও গেলাম।
দিন এবং মাস যত এগোতে থাকল এবং সীমান্ত পেরুবার জন্য জঙ্গিদের নেওয়া পথগুলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে যত নিশ্চিত হল, মৃতদেহগুলোও আসতে শুরু করল। সারিবেঁধে একের-পর-এক তরতাজা জোয়ান ছেলেগুলো হারিয়ে গেল গিরিবর্ত্ম পেরুতে গিয়ে বা ঘরে ফেরার পথে। যে স্টেডিয়ামে আমরা ক্রিকেট আর ফুটবল খেলতাম, যে সুন্দর সবুজ পার্কগুলোয় ছেলেবেলায় আমরা স্কুল থেকে এক্সকারশনে গেছি, সবগুলো শহীদের কবরস্থান হয়ে গেছে। একের পর এক, যারা এই জায়গাগুলোয় একদিন খেলত, তাদের কবর দেয়া হয়েছে এখানে, মার্বেলের বড় বড় স্মৃতিফলকে বিস্তারিত লেখা তাদের আত্মত্যাগের কথা। যাদের অনেকেই তাদের কালাশনিকভ থেকে একটা বুলেটও ছোঁড়েনি।
একদিন, আমাদের গ্রামের কাছের গোরস্থানটায় আমার বন্ধু আর সহপাঠীদের গুণলাম। ওখানে ২১ জন ছিল। মুস্তাকের হাসিমুখটা আমি এখনও মনে করতে পারি, আমাদের স্কুলজীবনের শুরু থেকে যাকে আমি চিনতাম। এই জানুয়ারিতে ওর বয়েস ৩১ হত। কিন্তু ওর নবম মৃত্যুবার্ষিকী আর মাত্র দু মাস বাদে। ওকে মেরে ফেলা হয় এপ্রিল, ১৯৯৩তে। ওর মা এই যন্ত্রণাটা সইতে পারেননি, পাগল হয়ে গেছেন। মৃত্যুর দিন মুস্তাক যে জামাটা পরেছিল সেটা হাতে নিয়ে উনি বছরভর গ্রামের চারদিকে শুধু ঘুরে বেড়িয়েছেন।
আরেক বন্ধু, জাভাইদ, বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। দারুণ সুপুরুষ চেহারা, কাশ্মীরে পরিবর্তন দেখার ভাবনাতে খালি ডুবে থাকত। ও যেদিন মারা যায়, আমার একটা জামা গায়ে ছিল ওর। সকালে আমাদের বাড়ি এসেছিল, ওখানেই নিজেরটা পালটে আমারটা পরে। ওর তখন ২৩, ওর মারা যাওয়ার ছ’ ঘন্টা পরে যখন ওকে দাফন করতে নিয়ে যায়, তখনও ওর বুলেটক্ষত থেকে তলতলে রক্ত চুঁইয়ে বেরুচ্ছে। সেই মুহূর্তটা আমি কখনও ভুলব না যখন ওর মুখ থেকে কফিনের ঢাকনাটা সরালাম : সেই বরাবরের মতো একমুখ হাসি। এক মুহূর্তের জন্য, আমার মনে হয়েছিল ও বেঁচে আছে।
জাভাইদের বোনের বিয়ে ছিল আর পনেরো দিন বাদেই। কিন্তু জাভাইদের চলে যাবার আঘাতে ওর হার্ট অ্যাটাক হল। বিয়ের অল্প ক’দিন আগেই ও মরে গেল।
আজ পাঁচশোরও বেশি শহিদের কবরখানা সারা কাশ্মীরে ছড়িয়ে আছে। কবরের সমাধিগুলোতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা স্মৃতিফলক একটা গল্প বলে। আমার প্রজন্মের শোকাবহ গল্প। স্মৃতিফলক খোদাই করা আজকে একটা লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে এখানে।
নিহত কাশ্মীরির সংখ্যা যত বাড়তে থাকল, এই হিংসাত্মক আন্দোলনকে বিশ্ব শুধুমাত্র ভারত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজেদের শাসনাধীন ভূভাগ নিয়ে বচসা হিসেবেই দেখল; যে বচসার সূত্রপাত ১৯৪৭-এর দেশভাগে। ভারত এই বিদ্রোহকে বরাবর পাকিস্তানের তৈরি করা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বলে এসেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এটাকে ‘জিহাদ’ হিসেবে দেখায় — একই ধর্মে বিশ্বাসী হওয়ায় পাকিস্তানে সংযুক্তির জন্য যা একটা কাশ্মীরি সংগ্রাম।
ভারতের সাপেক্ষে, কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও সমঝোতা নেই — এটা দেশের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’। ভারতীয় সঙ্ঘের একমাত্র মুসলিম-প্রধান রাজ্য এটা, ফলত গণতন্ত্রের একটি ভিত্তিপ্রস্তর এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্য পরিচয়পত্র। পাকিস্তানের সাপেক্ষে, কাশ্মীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে মুসলিম জনাধিক্য — এটা পাকিস্তানের ‘মাতৃকাশিরা’, এবং উপমহাদেশ বিভাজনের অসমাপ্ত কাজ, যে বিভাজন থেকে পাকিস্তান জন্মেছিল ভারতীয় মুসলিমদের আপন ঘর হিসেবে।
কাশ্মীরের ওপর এইসব দাবিদাওয়ার সাথে, দুটো দেশই কাশ্মীরিদের গলাটা চেপে ধরেছে। ভারত সরকার তার প্রতিক্রিয়া দিয়েছে লৌহমুঠিতে, বিরাট সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে এবং কাশ্মীরকে মস্ত একটা জেল বানিয়ে ছেড়েছে।
পাকিস্তানের হাতও পরিষ্কার নয়। ১৯৯০তে যখন কয়েকশো হাজার কাশ্মীরি যুবক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে বেরিয়ে এল, তখন এই ভূমিটার জন্য পাকিস্তানের উদগ্র কামনার মুখও খুলে গেল। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে হাইজ্যাক করল পাকিস্তান, সেটাকে ধর্মীয় মৌলবাদের রঙ দিল এবং পাকিস্তান-সমর্থিত বলে উত্থাপন করল এবং পরবর্তীতে জিহাদি দলকে ঢুকিয়ে দিল এর উপভোগ্য সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে নিরাপদ করতে।
বছর খানেকের মধ্যে, নিখিল ইসলামি জিহাদের আরেকটা রণাঙ্গন হয়ে গেল কাশ্মীর, এবং এর নেতারা এদের বীরপুরুষদের মতোই অ-কাশ্মীরিদের তৈরি করে নিল যাদের কর্মসূচী আত্ম-নিয়ন্ত্রণের মূল দাবিটাকেই সীমার বাইরে নিয়ে গেল। এইসব ব্যাপারের মধ্যে, কাশ্মীরিদের সংহতিসাধনের জন্য আসল যে রাজনৈতিক সংগ্রাম আর নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারের জন্য মানুষের যে দাবি সেটা সবাই ভুলে গেল।
যে মনোযোগ কাশ্মীরের ওপর দেওয়া হয় সেটা কিন্তু এইজন্যে নয় যে কাশ্মীরিরা ভুগছে, বরং এত মনোযোগ এইজন্যে কারণ এই জায়গাটা পরমাণু শক্তিধর দুটো দেশের ক্রোধ ও হিংসার শিখা বিস্তারের অন্তিম বিন্দু। ভারত এবং পাকিস্তান দুজনকেই কাশ্মীর নিয়ে একটাই নীতি গ্রহণ করতে দেখা গেছে। কাশ্মীরিদের ওপর ক্ষমতা চালাও যাতে নিজ নিজ সীমান্ত-রেখাগুলোকে পরস্পরের দিকে ঠেলা যায়। বস্তুত, দেখা যাচ্ছে যে দুটো দেশই চাইছে শেষ কাশ্মীরিটির থাকা অবধি লড়ে যেতে।
১৯৯৬ সালে ভারত সরকার রাজ্য নির্বাচন আয়োজন করল, আপাতদৃষ্টিতে যার লক্ষ্য ছিল কাশ্মীরে একটা প্রতিনিধি সরকারকে সুরক্ষিত করা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। নিরাপত্তা বাহিনী দঙ্গল বেঁধে লোক নিয়ে গেছে ভোটকেন্দ্রে, তারা আদৌ ভোট দিয়েছে কিনা এটা পরীক্ষা করার জন্য তাদের তর্জনীর নখে ভোটের কালি রয়েছে কিনা দেখতে তাদেরকে দিয়ে ‘নেইল প্যারেইড’ পর্যন্ত করায়।
যে লোকটি কাশ্মীরের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, শুধু নয়া দিল্লিতেই নয় বরং গোটা দুনিয়ার কাছেই তিনি তখন ভারতের জুনিয়র বিদেশমন্ত্রী, তিনি ওমর আবদুল্লা, কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লার পুত্র। পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগের পরও তিনি মাত্র ৫% ভোট পেলেন তাঁর নিজের নির্বাচন কেন্দ্রে। এবং জিতে গেলেন। কার্যত তিনি কার প্রতিনিধি হলেন, কেউ জানে না।
আমি এই সমস্ত কিছুর সাক্ষী থেকেছি। কাশ্মীরকে পালটে যেতে দেখেছি আমি। আমার এখনও মনে পড়ে, আকাশের রঙ লাল হয়ে এলে আমার নানী যখন উদ্বিগ্ন হয়ে বলতেন, ‘কোথাও খুনের জোগাড় হল রে’। লাল আকাশ দেখার অপেক্ষায় এই সন্দেহ আজকে আর তুলে রাখা যায় না : দৈনিক নিহতের সংখ্যা ২০।
অপরাধমুক্ত এলাকা হিসেবে কাশ্মীর বরাবর পরিচিত। আমার এক প্রতিবেশী আশির দশকের মাঝমাঝি সময়ে সিনিয়র পুলিশ অফিসার ছিলেন। একবার আমায় তিনি বলেছিলেন, কাশ্মীরে বছরে গড়পড়তা খুনের হার ৩ কি ৪। আজ, যদি তিনজন মারা যায় একদিনে, পরিস্থিতি শান্ত বলেই ধরা হয়।
আমার ভাগ্য যথেষ্ট ভালো যে অক্ষত আছি, কিন্তু আমার পরিবার এবং আত্মীয়দের সেরকম ভাগ্য নেই। আমার ছোট ভাই, মুদাবিরকে জঙ্গি সন্দেহে তুলে নিয়ে যায় ১৯৯৪ সালে, এবং ও কোথায় আছে এটা জানতেই আমাদের গোটা মাস লেগে যায়। আমাদের পরিবারের লোকেরা সবাই গোটা উপত্যকায় ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ি। প্রত্যেকদিন সকালে, আমাদের বাড়ির প্রত্যেকটা লোক নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পগুলোয় চক্কর কাটত, ওকে খুঁজে পাবার জন্য।
আমার মা তাঁর গোটা জীবনে কখনও একটা পুলিশ চৌকিতেও যাননি, কিন্তু সেই সময়ে শেষ অবধি তিনিই আমার ভাইকে খুঁজে পান; শ্রীনগরের চারদিকে প্রায় সবক’টা মিলিটারি ক্যাম্প তিনি চিনে ফেলেছিলেন।
পরে নিরাপত্তা বাহিনী বুঝতে পারে যে ভাই নির্দোষ এবং ওকে ছেড়ে দেয়। এতোটাই অত্যাচার করা হয়েছিল ওর ওপর যে পরের দু মাস টানা বিছানায় কাটাতে হয় ওকে।
সাত বছর হয়ে গেল ওকে ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু ঘুমের ভেতর এখনও ও দুঃস্বপ্ন দ্যাখে আর কোনও সেনা দেখলেই মেরুদাঁড়া দিয়ে কাঁপুনি নামতে থাকে। রাতের দিকে দরজায় টোকা পড়লে এখনও ওর গায়ে কাঁটা দেয়, বুকের শব্দ বাড়তে থাকে। কিন্তু কাশ্মীরে এটা আদৌ কোনও আশ্চর্য ঘটনাই নয়।
এক কাজিনের হাজবেন্ড সন্ধেবেলা মসজিদ থেকে ফেরার পথে ক্রসফায়ারের মাঝখানে পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মারা গেল। সময় মতো হাসপাতালে নিতে পারলে হয়তো বেঁচে যেত। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী পরিবারের কাউকে ঘর থেকে বেরুতে এবং তাকে হাসপাতালে নিতে দেয়নি। মেডিকেল হেল্পের আর কোনও উপায়ও সেখানে ছিল না। সাহায্যের জন্য কাঁদতে কাঁদতে লোকটা ওই অবস্থায় মরে গেল। আর তার বউ, মা আর ভাই নিজেদের অসহায়তা দেখে যাওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারল না। ওর মারা যাওয়ার চারমাস পরে একটা ছেলে জন্মায় ওই বাড়িতে।
১৯৯২ নাগাদ, হাতে গোনা কয়েকজন যুবকই হয়তো আমার বাড়ির চারপাশে, উত্তর কাশ্মীরের অল্প ক’টা গ্রামগুলিতে পড়েছিল। বেশিরভাগই জঙ্গি আন্দোলনে ঢুকে পড়েছে। কেউ মারা গেছে। কেউ লুকিয়ে পড়েছে। কয়েকজন আত্মসমর্পণ করেছে, কাউন্টার ইনসারজেন্সিতে ঢুকে সরকার পক্ষের মিলিসিয়্যার অংশ হয়ে গেছে। আরও অনেকে চলে গেছে এই এলাকা ছেড়ে শ্রীনগরের শহুরে এলাকার দিকে, ওটা তখনও তুলনায় নিরাপদ বলে ভাবা হত।
বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের স্বাভাবিক রঙটা খুব দ্রুত পালটাচ্ছিল। এখানকার মানুষের প্রকৃত রাজনৈতিক আকুলতাকে এটা আর কোনওভাবেই প্রতিনিধিত্ব করছিল না। কাশ্মীরের প্রকৃত ভাবসত্তার কাছে এদের চরমপন্থা যে বেমানান আর অসঙ্গতিপূর্ণ সেই সত্যটাকে উপেক্ষা করেই পাকিস্তানি আনুকূল্যের জিহাদি গোষ্ঠীগুলো, যারা আন্দোলনটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেখেছিল, তাদের মূলগত ধর্মীয়, সামাজিক আর সাংস্কৃতিক কর্মসূচীগুলো চাপাতে চেষ্টা করল।
সংমিশ্রিত সংস্কৃতি আর ধর্মীয় সহিষ্ণুতার একটা ইতিহাস আছে কাশ্মীরের। বস্তুত, তলোয়ারের শোরগোল তুলে কাশ্মীরে ইসলাম প্রবেশ করেনি। আধ্যাত্মিক মরমিয়াবাদী আর সুফিদের হাত ধরে এখানে এসেছিল ইসলাম, যাঁরা এখানকার মানুষদের হৃদয় জিতে নিয়েছিলেন। কয়েক শতাব্দী ধরে কাশ্মীর হয়ে উঠেছিল ভাবনা-চিন্তার বিগলিত পাত্র। বৌদ্ধ, হিন্দু আর ইসলামের এক মিলনভূমি; ধর্মীয় চরমপন্থার কোনও জায়গা যেখানে নেই।
এখন, উগ্র ধর্মান্ধতা যত আধিপত্য ছড়াচ্ছে, বন্দুকের ক্ষমতাকে যত কাজে লাগাচ্ছে, নিজের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতকে টুকরো ক’রে রক্তাক্ত করতে পাকিস্তানি পরিকল্পনায় ততোই নিছক এক সহায়ক যন্ত্র হয়ে উঠছে জঙ্গি আন্দোলন।
কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এবং শ্রীনগরে চলে যাওয়ার জন্য আমি আমার গ্রাম ছাড়বার সিদ্ধান্ত নিলাম। ছেড়ে বেরুবার জন্য আমি এতোটাই বেপরোয়া ছিলাম যে প্রায় সবক’টা বিভাগেই ভর্তির আবেদন করেছিলাম। এটা নিছকই আমার কপাল যে আমি সাংবাদিকতায় ভর্তির সুযোগ পেলাম। তার পরের বছর থেকে যখন আমি যুদ্ধ নিয়ে লিখতে শুরু করলাম, বুঝতে পারলাম এই শোকাবহ গল্পের শুরু থেকেই আমি এর একটা অংশ হয়ে গেছি। আমি জঙ্গিদের চিনতাম, চিনতাম মুখবিরদের (পুলিশের চর); যারা ধরা দিয়েছে আর যারা দেয়নি; যারা মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েছে কেননা তাদের একটা স্বপ্ন ছিল আর যারা শূলে গাঁথা বিষয়টার কিছুই না জেনে না বুঝে নেহাতই একটা সুযোগ পেয়ে আত্মত্যাগ করে দিয়েছে; চিনতাম তাদের যারা একটা পবিত্র যুদ্ধে যোগ দিয়েছে বলে বিশ্বাস করত আর যারা যোগ দিয়েছিল অশুভ কারণে; তাদের সবাইকে চিনতাম আমি। কিন্তু, এসব হওয়ার সাথে, গল্পে আরও কিছু বাকি ছিল তখনও।
সাংবাদিক হিসেবে আমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল একটা থানায় যাওয়া এবং সেখানে রাখা কিছু মৃতদেহ সম্পর্কে তথ্য নেওয়া। লোকাল কয়েকজন ফোটোগ্রাফারকে আমি সঙ্গী হিসেবে নিলাম, ওরা ছবি তুলতে শুরু করল যখন আমি বুলেট-ফুটো হওয়া ছ’টা দেহর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম। ভয়ানক অবস্থায় ছিল বডিগুলো। রক্ত-ভেজা জামা, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে, মুখ দেখে চেনা যায় না।
সেই সন্ধেয়, রক্তের পুকুরে শুয়ে থাকা বডিগুলোর ছবি বারবার হানা দিতে থাকল আমার মনে — এমনকী খাবার জলও আমায় রক্তের কথা মনে করাচ্ছিল। কয়েকদিন ঘুমোতে পারিনি; স্বপ্নের ভেতরে বারবার এসেছে ডেড-বডিগুলো।
এর মাসখানেক পর আমি এমন একটা হত্যাকাণ্ডের জায়গায় গেলাম যেখানে মহিলা, পুরুষ সবাই তালগোল পাকিয়ে জড়ো হয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে। শুইয়ে রাখা বডিগুলো বাচ্চাদের ফেলে দেওয়া ন্যাকড়ার পুতুলের মতো চারদিকে ছড়ানো। আমার গলার কাছটায় একটা মাংসের ডেলা বড় হতে লাগল, অসম্ভব ভারী লাগল আমার পা, অবিশ্বাস্য ক্লান্ত মনে হচ্ছিল আমার নিজেকে, মনে হচ্ছিল খাতা-পেন ছুঁড়ে চুপচাপ এই বিলাপরত মানুষগুলোর পাশে বসে থাকি। ক্যামেরার শাটারের শব্দ আমার চিন্তার ভেতর ঢুকে পড়ছিল ঝাঁকে ঝাঁকে, আমাকে যে আরও একটা রিপোর্ট লিখতে হবে, আরেকটা স্টোরি লিখতে হবে সেটা মনে করিয়ে পেছন থেকে ঠেলছিল আমাকে শাটারের শব্দগুলো।
বছরের পর বছর, এইভাবে অবিচুয়ারি লেখাটা রুটিন হয়ে গেছে। হিংসা যখন দাপিয়ে বেড়ায় গোটা দিন, পাঠকের হৃদয়ে ধাক্কা দিয়ে যাওয়া চোখের জল ছাড়া তাতে আর কিছুই থাকে না। রক্তময় মৃত্যুর বর্ণনা দেওয়া থেকে যদি আমি নিজেকে সরিয়ে নিতাম, অনাথ আর বিধবাদের কথাও শেষ হয়ে যেত আমার লেখায়। এইভাবে চলতে চলতে, এরকম ঘটনাগুলোর প্রতি আমার অন্তক্রিয়াও পালটাতে শুরু করল। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর সাথে আমি এখন আর রিলেটই করতে পারি না। এখন হত্যা মানে শুধু স্টোরি, রিপোর্ট আর বাইলাইন। এখন তাদের কলমে নামিয়েও তৃপ্তি পাওয়া যায়, এমনকী যদি সেই নিহতরা আমার ব্যক্তিগত পরিচিত কেউ হয়, তবুও।
মৃত্যু আর ধ্বংসের সাথে এই অনবরত আন্তঃক্রিয়া এক আবশ্যিক রোমাঞ্চ দিতে থাকল, আর এই মৃত্যু উপত্যকা আমার কাছে হয়ে গেল কেবলমাত্র সংবাদের চারণভূমি। রোজ সন্ধেয়, আমি পুলিশ বুলেটিনের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকি, যা আমাকে দৈনিক মৃত্যু হার জানাবে। অনেকটা একজন দোকানদারের মতো, যে ঝাঁপ বন্ধ করার আগে ক্যাশ বাক্স খুলে দিনের টাকা গোণে, আমি আমার অফিস ছেড়ে বেরুবার আগে গুণি আজ কতজন মরল। একবার আমি ক্যালকুলেটর নিয়ে বসেছিলাম ২৪ ঘন্টায় ১২টা জেলা জুড়ে ১০৫ জন মৃত নারী-পুরুষের সংখ্যা গুণতে। আমার কাগজ আমার কাছে জবর খবর চায় আর আমি নিজেকে দেখতে পাই সংখ্যাগুলোর ভিড়ে হারিয়ে যেতে।
কাশ্মীরের এক অভিশপ্ত প্রজন্ম থেকে আমি এসেছি — নব্বই দশকের প্রজন্ম। এই গণবিক্ষোভ আর উত্তেজনার বছরগুলোয় আমি কাশ্মীরেই থেকেছি, এখনও আমি ভালো আছি এবং বেঁচে আছি। কিন্তু এই গোটা প্রক্রিয়ায় আমার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। সাধারণ মানবিক অনুভূতিগুলো আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার স্বদেশের রোজকার হিংসাত্মক সংবাদ অভিযানে। আমার নিজের মানুষদের মৃত্যুর শোক থেকেও আমি বিযুক্ত হয়ে পড়েছি; এমন একটা অযোগ্যতা আমি গড়ে তুলেছি যা এই শোকে বিলাপে অক্ষম।
এবং দেখা যাচ্ছে বহির্জগতও কাশ্মীরের যন্ত্রণাটা বুঝতে অপারগ। ৫০ হাজারেরও বেশি মৃত্যুর পরও শান্তির দিকে কোনও অগ্রগতি এখনও দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর উচিত ভারত-পাকিস্তানের মধ্যেকার সমস্যাগুলোর সমাধানযোগ্য উপায় সুনিশ্চিত করা। একটা পরমাণু যুদ্ধ ঠেকাবার জন্যই শুধু এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কাশ্মীরের মানুষদের যন্ত্রণামুক্তির জন্যেও এটা অত্যন্ত জরুরি।
Leave a Reply