অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

I write to understand what remains after everything leaves

আত্মকথন (৩)

মাঝে মাঝে মনে হয়, উপন্যাস লিখে আমি যেন নিজের জন্য অপ্রয়োজনীয় এক স্থাপত্য নির্মাণ করছি। চরিত্রের জন্য আলাদা ঘর, প্লটের জন্য সিঁড়ি, ক্লাইম্যাক্সের জন্য জানালা। সব কিছু মেপে দিতে হয়। যেন আমি একজন স্থপতি, অথচ ভিতরে ভিতরে আমি আসলে এক ভ্রমণকারী—যার কাছে মানচিত্র নেই, আছে শুধু হাঁটার তাগিদ।

এই সময়েই মনে পড়ে অ্যানাই নিন (Anaïs Nin)-এর কথা। তিনি যেন জীবনের ভেতরেই বসে লিখেছেন, জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়। তাঁর ডায়েরি কোনও নির্মাণ নয়, বরং এক অন্তহীন প্রবাহ—যেখানে প্রতিদিনের অনুভূতি, স্বপ্ন, যৌনতা, ভয়, অপরাধবোধ, আত্মপ্রেম—সব কিছু একই পৃষ্ঠায় এসে বসেছে। সেখানে গল্পের শৃঙ্খলা নেই, আছে আত্মের স্পন্দন।

আত্মকথন (২)

মঞ্চ খালি। আলো জ্বলে আছে—কিন্তু কারও জন্য নয়।
একজন অভিনেতা দাঁড়িয়ে আছেন, সংলাপ মুখস্থ, শরীর প্রস্তুত।
তিনি জানেন, কেউ আসেনি। তবু তিনি শুরু করতে পারেন না।
কারণ অভিনয় মানেই প্রতিধ্বনি।
শব্দটি ছুড়ে দিলে দেয়ালে লাগে না—লাগে চোখে।

অভিনেতার শিল্প ঋণী উপস্থিতির কাছে।
স্তানিস্লাভ্‌স্কি হয়তো বলতেন, সত্যিকারের অভিনয় মানে ‘বিশ্বাস’—কিন্তু সেই বিশ্বাসেরও তো একটি সাক্ষী দরকার।
মঞ্চের কাঠামো এমনই:
এখানে ‘আমি’ কখনও একা সম্পূর্ণ হয় না।

আত্মকথন (১)

আমার গল্পের চরিত্রেরা, আবহেরা, চিরকাল আমার কাছে এমন এক দুর্গম অন্ধকারমালা বিছিয়ে রেখেছে, রেখে বলছে, ‘‘বাইরে দাঁড়াও। ভেতরে তোমার প্রবেশ অধিকার নেই।’’ আমি চেষ্টা করি গল্পগুলোর কোনও চরিত্রকে ঘুষ দিয়ে পটিয়ে-পাটিয়ে ভেতরে ঢোকার ছাড়পত্রটা যদি জোগাড় করতে পারি। হচ্ছে না। এ হবে না। আমি এখানে অ্যাবসোলিউটলি স্ট্রেঞ্জার। ফলে আমার কোনও চরিত্রকে নিয়েই তাদের মতো করে নিটোল পরিপাটি গল্প লেখা আমার হয়ে ওঠেনি। চিরকাল আমি যেটা করেছি, গল্পের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চরিত্রদের ভাসা ভাসা গলার মৃদু আওয়াজ পেয়ে লিখেছি। আড়ি পাতা। আমার অযোগ্যতাই আমার সব গল্পের বিষয়। দক্ষতা নয়, আমার অদক্ষতাই আমার গল্পের চালক। আমার জানা নয়, আমার অজানাই আমার রহস্য। রাতের তারার আলোয় আমি যে গল্প ও তাদের চরিত্রদের সামান্য অবয়বটুকু দেখেছি, সেটাই বলি না-হয়। লেখক হয়েছি বলে খামোকা তারার আলোয় দেখা চরিত্রকে দিনের শাদা আলোয় দেখার ভান কেন করব!

Page 6 of 6

© 2026 Arjun Bandyopadhyay. All rights reserved. | Website developed by Sudip Palodhi