I write to understand what remains after everything leaves

Category: ছোটগল্প

প্রসঙ্গ: মার্ক্সের মৃত্যু – একটি নতুন গল্প

নতুন গল্পটি লিখতে বসার মুহূর্তে আমি জানতাম না আমি একটি আখ্যান লিখতে যাচ্ছি, নাকি একটি ভূত-রিপোর্ট, নাকি নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছি। ‘মার্ক্সের মৃত্যু’—শিরোনামটি প্রথমে এসেছিল কবি হিন্দোল ভট্টাচার্যের কথায়, একটি তারিখের ভিতর থেকে। ১৪ই মার্চ। মার্ক্সের মৃত্যুদিন। একই দিন নন্দীগ্রামের রক্তস্মৃতি। সেই তারিখের ভেতরে যেন ইতিহাসের দুটি আলাদা শিরা স্পন্দিত হচ্ছিল। আমি গল্প লিখতে বসিনি; আমি একটি তারিখের ভেতরে ঢুকতে বসেছিলাম।

টানা ছ-সাত ঘণ্টা। এক বৈঠকে। আড়াই হাজার শব্দ। এই ফর্মে আগে লিখিনি। পঁচিশ বছরে সত্তরটিরও বেশি গল্প লিখেছি—কিন্তু সেখানে আখ্যানের একটা দৃশ্যমান কঙ্কাল থাকত। এখানে লিখতে বসেই বুঝলাম, কঙ্কালটি সরিয়ে ফেলতে হবে। যেন ভাষা নিজেই নিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, অথচ যেকোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।

আত্মকথন (৬)

একটা উৎকৃষ্ট গদ্য লিখনকালীন যে তৃপ্তি—তার তুলনা খুঁজতে গিয়ে মানুষ শরীরের দিকে তাকায়। আমি তাকাই ভাষার দিকে। শরীরের চূড়ান্ত মুহূর্তে যে বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে, তা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু বাক্যের ভিতর যে আগুন ধীরে ধীরে পাকে, তা দীর্ঘস্থায়ী, তা পুনর্গঠিত হয়, তা ফিরে আসে স্মৃতির ভেতর, পুনরায় পাঠে, পুনরায় উচ্চারণে।

যৌনসুখ একটি বিস্ফোরণ। লেখা একটি নির্মাণ। বিস্ফোরণ শেষে দেহ ক্লান্ত হয়; নির্মাণ শেষে মন স্থির হয়। দেহের তৃপ্তি এক প্রকার অবসান—লেখার তৃপ্তি এক প্রকার সূচনা। একটি গদ্য যখন নিজের ছন্দে দাঁড়িয়ে যায়, যখন একটি বাক্য আরেকটি বাক্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয় যেন তাদের আলাদা করা যায় না, তখন মনে হয় আমি কেবল লিখিনি—আমি এক প্রকার অস্তিত্ব নির্মাণ করেছি।

আত্মকথন (৫)

হোয়াটসঅ্যাপে স্টেটাস দিয়েছিলাম তারিখবিহীন এই ডায়েরির পাতা। আমার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র এক ভ্রাতৃপ্রতিম জিগ্যেস করল, কামু এখানে ‘I’-এর পর ‘is’ কেন বলেছিলেন।

আমার উত্তর:

কামুর ‘দ্য ফল’ উপন্যাসের নায়ক ক্লামাঁস বলেন, ‘I, I, I is the refrain of my whole life’… এখানে ‘are’ এর পরিবর্তে ‘is’ ব্যবহারের বিষয়টি একটি সচেতন ব্যাকরণগত সিদ্ধান্ত, যার উদ্দেশ্য একক, আত্মমগ্ন আসক্তির (narcissistic, singular obsession) বিষয়টিকে তুলে ধরা।

আত্মকথন (৪)

আমার নিজের তা কখনও মনে হয় না যে আমি ছবির মানুষ—আঁকার অর্থে তো নয়ই। আমি মূলত লেখামানুষ। শব্দই আমার উপাদান, বাক্যই আমার উপকরণ। আমি ছবি আঁকি না ছবি আঁকার জন্য। আঁকি তখনই, যখন একটি লেখা আমার ভিতরে জট পাকিয়ে বসে থাকে, যখন বাক্যগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যখন পথ হারিয়ে ফেলি। তখন আমি কাগজে দাগ কাটি—রেখা, ছায়া, কিছু অনির্দিষ্ট আকার। যেন লেখার মেজাজটা স্পর্শ করতে পারি। যেন ভাষার আগে যে অন্ধকার, তার মানচিত্র একটু আঁচ করা যায়।

আমি জানি, এটা কোনও আলাদা শিল্পচর্চা নয়। এটা পথ খোঁজার কৌশল। যেমন Coetzee নাকি লেখায় আটকে গেলে কাঠের কাজ করতেন—হাতুড়ি, কাঠ, মাপজোক; শব্দের বদলে বস্তু। যেমন Henry Miller হঠাৎ টেবিল ছেড়ে কেটে পড়তেন—হাঁটতে, ঘুরতে। যেমন মারকেস দরজা-জানলায় রং করতেন—এক ধরনের মনোসংযোগ, যেখানে গল্পের ভেতরের রঙ ধীরে ধীরে বাইরের রঙে মিশে যায়।

আত্মকথন (৩)

মাঝে মাঝে মনে হয়, উপন্যাস লিখে আমি যেন নিজের জন্য অপ্রয়োজনীয় এক স্থাপত্য নির্মাণ করছি। চরিত্রের জন্য আলাদা ঘর, প্লটের জন্য সিঁড়ি, ক্লাইম্যাক্সের জন্য জানালা। সব কিছু মেপে দিতে হয়। যেন আমি একজন স্থপতি, অথচ ভিতরে ভিতরে আমি আসলে এক ভ্রমণকারী—যার কাছে মানচিত্র নেই, আছে শুধু হাঁটার তাগিদ।

এই সময়েই মনে পড়ে অ্যানাই নিন (Anaïs Nin)-এর কথা। তিনি যেন জীবনের ভেতরেই বসে লিখেছেন, জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়। তাঁর ডায়েরি কোনও নির্মাণ নয়, বরং এক অন্তহীন প্রবাহ—যেখানে প্রতিদিনের অনুভূতি, স্বপ্ন, যৌনতা, ভয়, অপরাধবোধ, আত্মপ্রেম—সব কিছু একই পৃষ্ঠায় এসে বসেছে। সেখানে গল্পের শৃঙ্খলা নেই, আছে আত্মের স্পন্দন।

আত্মকথন (২)

মঞ্চ খালি। আলো জ্বলে আছে—কিন্তু কারও জন্য নয়।
একজন অভিনেতা দাঁড়িয়ে আছেন, সংলাপ মুখস্থ, শরীর প্রস্তুত।
তিনি জানেন, কেউ আসেনি। তবু তিনি শুরু করতে পারেন না।
কারণ অভিনয় মানেই প্রতিধ্বনি।
শব্দটি ছুড়ে দিলে দেয়ালে লাগে না—লাগে চোখে।

অভিনেতার শিল্প ঋণী উপস্থিতির কাছে।
স্তানিস্লাভ্‌স্কি হয়তো বলতেন, সত্যিকারের অভিনয় মানে ‘বিশ্বাস’—কিন্তু সেই বিশ্বাসেরও তো একটি সাক্ষী দরকার।
মঞ্চের কাঠামো এমনই:
এখানে ‘আমি’ কখনও একা সম্পূর্ণ হয় না।

আত্মকথন (১)

আমার গল্পের চরিত্রেরা, আবহেরা, চিরকাল আমার কাছে এমন এক দুর্গম অন্ধকারমালা বিছিয়ে রেখেছে, রেখে বলছে, ‘‘বাইরে দাঁড়াও। ভেতরে তোমার প্রবেশ অধিকার নেই।’’ আমি চেষ্টা করি গল্পগুলোর কোনও চরিত্রকে ঘুষ দিয়ে পটিয়ে-পাটিয়ে ভেতরে ঢোকার ছাড়পত্রটা যদি জোগাড় করতে পারি। হচ্ছে না। এ হবে না। আমি এখানে অ্যাবসোলিউটলি স্ট্রেঞ্জার। ফলে আমার কোনও চরিত্রকে নিয়েই তাদের মতো করে নিটোল পরিপাটি গল্প লেখা আমার হয়ে ওঠেনি। চিরকাল আমি যেটা করেছি, গল্পের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চরিত্রদের ভাসা ভাসা গলার মৃদু আওয়াজ পেয়ে লিখেছি। আড়ি পাতা। আমার অযোগ্যতাই আমার সব গল্পের বিষয়। দক্ষতা নয়, আমার অদক্ষতাই আমার গল্পের চালক। আমার জানা নয়, আমার অজানাই আমার রহস্য। রাতের তারার আলোয় আমি যে গল্প ও তাদের চরিত্রদের সামান্য অবয়বটুকু দেখেছি, সেটাই বলি না-হয়। লেখক হয়েছি বলে খামোকা তারার আলোয় দেখা চরিত্রকে দিনের শাদা আলোয় দেখার ভান কেন করব!

© 2026 Arjun Bandyopadhyay. All rights reserved. | Website developed by Sudip Palodhi