আমি প্রায় পঁচিশ বছর ধরে লিখছি। এই পঁচিশ বছরে আমার নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে কিছু বই, কিছু উপন্যাস, কিছু গল্প, কিছু অসমাপ্ত খাতা। ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ লিখেছি। ‘মরণ-অন্তরালে’, ‘ব্রেনফিভার’, ‘সেক্স অ্যান্ড ফিলোসফি’, ‘পৃথা কখন আসবে’, ‘এখানে আমি কী করছি’, ‘ভারতীয় নোটবুক’, ‘দুপুরে সন্ধ্যার মেঘ’, আটটি উপন্যাস লিখেছি। অথচ লিখতে চেয়েছিলাম একটা। এ তো পাপ। ‘এত লেখা অসভ্যতা।’

কথাটা আমার নয়। রবীন্দ্রনাথের। মৃত্যুর এক বছর আগে রানি চন্দকে বলেছিলেন।
তারপর গল্প—২০০৫ সাল থেকে শুরু হয়েছে ডি মেজরের গল্প। প্রথম গল্প, ‘লোকটা ও হাশমির ঘোড়া’। তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয়… ধীরে ধীরে সংখ্যাটা বেড়েছে। ‘ডি মেজর’-এ তেইশটা গল্প। তারপর তিরিশটা গল্পের কাজ, তারপর মার্কসের মৃত্যু এবং অন্যান্য গল্প। সব মিলিয়ে প্রায় চুয়াত্তরটি গল্প।
এই সংখ্যাগুলো উচ্চারণ করলে একটা পরিমাণ বোঝা যায়।
কিন্তু লেখালিখির জীবনে পরিমাণ খুব অদ্ভুত জিনিস।
কারণ এত কিছু লেখার পরেও আজকাল প্রায়ই মনে হয়—আমি এখনও একটা লাইনও লিখতে পারিনি।
এই বাক্যটা শুনলে অনেকের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু একজন লেখকের ভেতরে এই অনুভূতিটা খুব স্বাভাবিক। বরং আমি বলব—এই অনুভূতিটা না থাকলে লেখালিখি বোধহয় সত্যিই বিপদে পড়ে।
কারণ লেখার ভেতরে একটা অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। মানুষটা কোথাও গিয়ে থেকে যেতে চায়। ভাষার দেয়ালে, অভিজ্ঞতার দেয়ালে, অস্তিত্বের দেয়ালে। এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে চায় যেখানে আর এগোনো যায় না। যেখানে ভাষা হঠাৎ থেমে যায়। (এবং দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে সেরা কাজটা করাও যায় না।)
সেই জায়গাটাই আসলে লেখার সত্যিকার শুরু।
আমি যখন পিছন ফিরে আমার লেখা বইগুলোর দিকে তাকাই—বঙ্কিমচন্দ্র থেকে দুপুরে সন্ধ্যার মেঘ, ডি মেজরের গল্প—তখন আমার মনে হয়, এইসব বই হয়তো একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি ছাড়া আর কিছু নয়। যেন আমি অনেক বছর ধরে হাঁটছি, কিন্তু যে জায়গায় গিয়ে সত্যিই থেকে যাওয়ার কথা, সেখানে এখনও পৌঁছইনি।
লেখার একটা বড় বিপদ আছে—লেখক একসময় লিখতে শিখে ফেলে।
যখন কেউ লিখতে শিখে ফেলে তখন বাক্য তৈরি করা কঠিন থাকে না। চরিত্র বসানো যায়, দৃশ্য তৈরি করা যায়, গল্প এগিয়ে নেওয়া যায়। কৌশল তৈরি হয়ে যায়। ভাষা একটা অভ্যাস হয়ে ওঠে।
কিন্তু সেই সময়েই আসল বিপদটা ঘটে।
কারণ তখন লেখার মধ্যে থেকে আতঙ্কটা হারিয়ে যায়। আর আতঙ্ক ছাড়া সাহিত্য হয় না।
সত্যিকারের বাক্য তখনই জন্মায় যখন লেখক নিজেই জানে না পরের শব্দটা কী হবে। যখন লেখার মধ্যে একটা বিপদ থাকে। যখন মনে হয়—এই বাক্যটা লিখলে আমি নিজেই বদলে যাব।
এই অভিজ্ঞতা খুব কম আসে। হয়তো সারা জীবনে দু-একবার।
এই জন্যই অনেক সময় আমার মনে হয়—আমি এত বই লিখেছি, এত গল্প লিখেছি, তবু সেই একটিমাত্র বাক্যের কাছে পৌঁছতে পারিনি। সেই বাক্য যেটা লিখলে সত্যিই কোথাও গিয়ে ধাক্কা খাব।
আমি মনে করি, লেখক আসলে দেয়াল খুঁজে বেড়ায়।
মানুষের জীবনে অনেক দেয়াল আছে—সমাজের দেয়াল, ইতিহাসের দেয়াল, রাজনীতির দেয়াল। কিন্তু লেখকের জন্য সবচেয়ে কঠিন দেয়ালটা অন্য জায়গায়। সেটা ভাষার ভেতরে। ভাষা একসময় এসে থেমে যায়। তখন আর কিছু বলা যায় না। সেই মুহূর্তেই সাহিত্য জন্মায়।
আমার মনে হয়, আমার এই লেখালিখির জীবন আসলে সেই দেয়াল খোঁজার জীবন। আমি অনেক রাস্তা হেঁটেছি, অনেক বাক্য লিখেছি, অনেক গল্প বানিয়েছি—কিন্তু সেই দেয়ালটা এখনও পুরোপুরি পাইনি।
এই জন্যই আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ফ্রাস্ট্রেশন কাজ করে। মনে হয়—আমি এখনও একটা লাইনও লিখতে পারিনি।
কিন্তু এই ফ্রাস্ট্রেশনটাকে আমি সম্পূর্ণ নেতিবাচক বলেও মনে করি না। বরং আমি মনে করি, এই অনুভূতিটাই লেখালিখিকে বাঁচিয়ে রাখে।
যে লেখক মনে করে সে সব লিখে ফেলেছে—তার লেখা শেষ হয়ে যায়। যে লেখক মনে করে এখনও কিছুই লেখা হয়নি—সে এখনও লিখতে পারে।
আমার কাছে লেখালিখি এখন আর সাফল্যের প্রশ্ন নয়, বইয়ের সংখ্যার প্রশ্ন নয়, এমনকি পাঠকের সংখ্যার প্রশ্নও নয়। লেখা সঞ্চয় নয়। ক্ষয়। সাফল্য নয়। আত্মবিনাশ। বিষ নির্গতকরণ প্রক্রিয়া, না লিখলে বিষক্রিয়ায় মরে যেতে হত। আমার কাছে এখন লেখালিখি একটা অনুসন্ধানও। আমি খুঁজছি সেই একটিমাত্র বাক্য।
হয়তো সেই বাক্যটা খুব ছোট হবে। হয়তো একটা সাধারণ বাক্য—কিন্তু সেই বাক্যটা লিখতে গেলে আমাকে কোথাও গিয়ে থেকে যেতে হবে।
নিজের ভেতরের অন্ধকারে।
নিজের অভিজ্ঞতার সীমান্তে।
নিজের ভাষার শেষ প্রান্তে।
হয়তো সেই বাক্যটা এখনও আসেনি।
হয়তো সে অনেক দূরে।
কিন্তু আমার মনে হয়—একজন লেখকের জীবন আসলে সেই এক লাইনের জন্যই অপেক্ষা।
তার আগে যা কিছু লেখা হয়—সবই অনুশীলন। সবই প্রস্তুতি। সবই পথ হাঁটা।
এই কারণেই আজ এত বছর লেখার পরেও আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি—হ্যাঁ, আমি এখনও একটি লাইনও লিখতে পারিনি।
এবং হয়তো এই বাক্যটাই আমাকে আবার লিখতে বসাবে। জানি না…
১৬ই মার্চ, ২০২৬
গণপ্রজাতন্ত্রী উত্তর কলকাতা
Leave a Reply