Last month, in the first week of January, after a l cfong drought of almost sixteen months, I suddenly wrote nineteen stories one after another. Then I wrote one story in February and another long story in March. While working on them, I also translated each of those twenty-one stories into English.
After translating them, I sent the English versions to a publishing house along with a synopsis, an author bio, and a cover letter. However, the problem is that I have lost the Bengali files. What happened was that while converting the files, I accidentally replaced the Bengali versions with the English ones. As a result, the original Bengali files are no longer there.
আমি আপনার সংবাদপত্রে কাজ করতে পারব না। ফ্যাসিস্ট গেরুয়া দলের মুখপত্র হিসেবে কাজ করে যে পত্রিকা, সেখানে আমার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। কারণ এই দল, ভারতবর্ষে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতার চাষ করে আসছে দীর্ঘ বহু বছর ধরে। এই সমস্ত কিছুই আমি জানতাম, তবুও বিপদে পড়েই আপনার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম, যদি কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। আপনি আমাকে ফিরিয়ে দেননি। কিন্তু ওখানে আমার দম আটকে আসছিল। আমার সারাজীবনের লেখালেখি, এই ঘৃণা এবং বিদ্বেষপূর্ণ দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। লেখক এবং সাংবাদিক হিসেবে আমি সেই দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারি না। একদিকে ফ্যাসিস্ট গেরুয়া দলের বিরুদ্ধে লিখব, অন্যদিকে তাদেরই মুখপত্রের কাগজে চাকরিও করব, এই দ্বিচারিতার অর্থ কী! যে-কোনও পরিস্থিতিতে আদর্শের বিরুদ্ধে যাওয়ার অর্থ মৃত্যুবরণ করা। It is not possible for me even if I am financially starved. Hope you can feel my words.
নতুন গল্পটি লিখতে বসার মুহূর্তে আমি জানতাম না আমি একটি আখ্যান লিখতে যাচ্ছি, নাকি একটি ভূত-রিপোর্ট, নাকি নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছি। ‘মার্ক্সের মৃত্যু’—শিরোনামটি প্রথমে এসেছিল কবি হিন্দোল ভট্টাচার্যের কথায়, একটি তারিখের ভিতর থেকে। ১৪ই মার্চ। মার্ক্সের মৃত্যুদিন। একই দিন নন্দীগ্রামের রক্তস্মৃতি। সেই তারিখের ভেতরে যেন ইতিহাসের দুটি আলাদা শিরা স্পন্দিত হচ্ছিল। আমি গল্প লিখতে বসিনি; আমি একটি তারিখের ভেতরে ঢুকতে বসেছিলাম।
টানা ছ-সাত ঘণ্টা। এক বৈঠকে। আড়াই হাজার শব্দ। এই ফর্মে আগে লিখিনি। পঁচিশ বছরে সত্তরটিরও বেশি গল্প লিখেছি—কিন্তু সেখানে আখ্যানের একটা দৃশ্যমান কঙ্কাল থাকত। এখানে লিখতে বসেই বুঝলাম, কঙ্কালটি সরিয়ে ফেলতে হবে। যেন ভাষা নিজেই নিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, অথচ যেকোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।
মার্ক্সের মৃত্যু—এই কথাটা উচ্চারণ করার মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা আছে। যেন আমরা কোনও মানুষকে নয়, বরং একটি সময়কে সমাহিত করছি। একটি ভাষা, একটি স্বপ্ন, একটি ব্যাখ্যার পদ্ধতি—যা একসময় পৃথিবীকে বোঝার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় বলে মনে হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাসের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। সে কখনও কোনও চিন্তাকে একেবারে হত্যা করে না। সে তাকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে তোলে।
সম্ভবত মার্ক্সের মৃত্যু সেই ক্লান্তিরই অন্য নাম।
যে পৃথিবীর কথা তিনি কল্পনা করেছিলেন, সেই পৃথিবী এখনও এসে পৌঁছায়নি। আবার যে পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, সেটাকেও তাঁর ভাষায় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। এই অদ্ভুত ফাঁকেই মার্ক্সের প্রকৃত পরিণতি লুকিয়ে আছে—না সম্পূর্ণ উপস্থিত, না সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
মাঝে মাঝে মনে হয়, চিন্তারও এক ধরনের জৈব জীবন আছে। তারা জন্মায়, বিস্তার লাভ করে, তারপর ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব ওজনেই ভারী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তারা ইতিহাসের ভিতরে বসে থাকে—একটি পুরোনো বৃক্ষের মতো—যার ছায়া এখনও পড়ে, কিন্তু যার বীজ আর তেমনভাবে ছড়ায় না।
তবুও মৃত্যু শব্দটা এখানে পুরোপুরি সত্য নয়।
কারণ যতদিন অসমতা থাকবে, যতদিন মানুষের শ্রম অদৃশ্য হয়ে থাকবে, যতদিন ইতিহাসের ভেতরে কিছু মানুষ বারবার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে—ততদিন কোনও না কোনওভাবে সেই পুরোনো প্রশ্নগুলো ফিরে আসবে।
সম্ভবত মার্ক্স তখন আর একটি নাম থাকবেন না। তিনি হয়ে উঠবেন কেবল একটি অস্বস্তি। একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। একটি অসমাপ্ত বাক্য।
আর সেই কারণেই হয়তো তাঁর মৃত্যু কখনও সম্পূর্ণ হয় না।
ইতিহাস মাঝে মাঝে কাউকে সমাধিস্থ করে না—শুধু তাকে নীরব করে রাখে।
একটা উৎকৃষ্ট গদ্য লিখনকালীন যে তৃপ্তি—তার তুলনা খুঁজতে গিয়ে মানুষ শরীরের দিকে তাকায়। আমি তাকাই ভাষার দিকে। শরীরের চূড়ান্ত মুহূর্তে যে বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে, তা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু বাক্যের ভিতর যে আগুন ধীরে ধীরে পাকে, তা দীর্ঘস্থায়ী, তা পুনর্গঠিত হয়, তা ফিরে আসে স্মৃতির ভেতর, পুনরায় পাঠে, পুনরায় উচ্চারণে।
যৌনসুখ একটি বিস্ফোরণ। লেখা একটি নির্মাণ। বিস্ফোরণ শেষে দেহ ক্লান্ত হয়; নির্মাণ শেষে মন স্থির হয়। দেহের তৃপ্তি এক প্রকার অবসান—লেখার তৃপ্তি এক প্রকার সূচনা। একটি গদ্য যখন নিজের ছন্দে দাঁড়িয়ে যায়, যখন একটি বাক্য আরেকটি বাক্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয় যেন তাদের আলাদা করা যায় না, তখন মনে হয় আমি কেবল লিখিনি—আমি এক প্রকার অস্তিত্ব নির্মাণ করেছি।
মাঝে মাঝে মনে হয়, উপন্যাস লিখে আমি যেন নিজের জন্য অপ্রয়োজনীয় এক স্থাপত্য নির্মাণ করছি। চরিত্রের জন্য আলাদা ঘর, প্লটের জন্য সিঁড়ি, ক্লাইম্যাক্সের জন্য জানালা। সব কিছু মেপে দিতে হয়। যেন আমি একজন স্থপতি, অথচ ভিতরে ভিতরে আমি আসলে এক ভ্রমণকারী—যার কাছে মানচিত্র নেই, আছে শুধু হাঁটার তাগিদ।
এই সময়েই মনে পড়ে অ্যানাই নিন (Anaïs Nin)-এর কথা। তিনি যেন জীবনের ভেতরেই বসে লিখেছেন, জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়। তাঁর ডায়েরি কোনও নির্মাণ নয়, বরং এক অন্তহীন প্রবাহ—যেখানে প্রতিদিনের অনুভূতি, স্বপ্ন, যৌনতা, ভয়, অপরাধবোধ, আত্মপ্রেম—সব কিছু একই পৃষ্ঠায় এসে বসেছে। সেখানে গল্পের শৃঙ্খলা নেই, আছে আত্মের স্পন্দন।
বেশ কিছু বছর আগে কোচবিহারে কবি পাপড়ি গুহনিয়োগীর বাড়িতে ওঁদের পত্রিকার নাম নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম অরুণেশের পত্রিকার নামের কথা। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার নাম ছিল ‘জিরাফ’। সংকেত, ইঙ্গিত ও গূঢ়তাবাহী একটি নাম। এমন একটি প্রাণী জিরাফ, যে বোবা। নখ নেই, ধার নেই, আক্রমণ নেই, গতি নেই, শান্ত। কিন্তু মাথা সবার ওপরে। উঁচু। সিস্টেমের ভেতর আপাত নিরীহ হয়ে বসে, সমস্ত নজরদারি টপকে পালটা নজরদারির কথাই যেন ভাবায় জিরাফের ওই উঁচু মাথা।
অরুণেশের কথা হলে আমি সবসময়েই ওঁর বিস্ময়কর গল্পগুলোর কথা বলি। ‘পমি আয়নায়’, ‘মদ ও মেয়েমানুষ’, ‘কমরেড কেরুকে কেউ চিঠি লেখে না’, ‘মেয়েরাই বাঁচায়’, এরকম সব আন্তর্জাতিক মানের গল্প লিখেছেন উনি। যে গল্পে পালিশ নেই, এরকম একটা ভাষায় লিখতেন। যেন ধক করে মুখ দিয়ে কলজেটা বেরিয়ে পড়ে রয়েছে এক-একটা গল্পের পাতায়। আমার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ উপন্যাসে অনেক বড়ো একটা জায়গাজুড়ে ওঁর উপস্থিতি। সেখানে অরুণেশ যা করেছেন তা একমাত্র অরুণেশের পক্ষেই সম্ভব। ‘অরুণেশের অরুণেশগুলো’ নামে আমার একটি গল্প রয়েছে ‘ডি মেজর’ গল্প সংকলনে, যেখানে তিনি শরীরের প্রতিটি অংশ বিছানায় গয়নার মতো খুলে রাখছেন, যুদ্ধের রাতে সৈনিক যেভাবে তাঁবুর ভেতর অস্ত্র পেতে রাখে। অরুণেশ বলতেন, অর্জুন, তুমি কী তা কাউকে কোনও দিনও জানতে দিবা না। যদি দাও, তাইলে এই চাউটাল মালগুলা একদিন তোমারে কনভিনস করায়া তোমারে দিয়াই বলায়া নিবে যে তোমার মইধ্যে কোনও ট্যালেন্ট নাই। তুমি একটা ভুসি মাল। বাঙ্গি। বাঙ্গি বুঝো? কলকাতার লোকে যারে কয় খরমুজ। নিজের দশ বারোটা চেহারা তৈরি করো। তোমার আসল তুমিটার কেউ য্যান নাগালই না পায়। কেউ ভাববে এইডা তুমি, কেউ ভাববে ওইডা। ক্যামোফ্লেজ করো। তারপর বলতেন, আমি একটা পত্রিকা করতাম, বুঝলা। পত্রিকার নাম ছিল গিয়া জিরাফ। তা, জিরাফ ক্যান? জিরাফের দ্যাখো ভয়েস নাই। বোবা। হে রাষ্ট্র, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, আমার মুখ দিয়া টু শব্দও বাইর হইব না। জিরাফের দাঁত নখ থাবা কিসুই নাই। কিন্তু শির উচ্চ। সিস্টেম আর রাষ্ট্রের এত এত চোখ আর ক্যামেরার মইধ্যেও আমি গোবেচারা ভোলেভালা সাইজা সবার উপরে মাথা রাইখা সিস্টেমের উপরেই নজর চালাইতেসি। আমি যে বোবা। আমার যে নখ দাঁত থাবা নাই। তাই রাষ্ট্র আমারে অত পাত্তা দেয় নাই। আমারে নিয়া গুরুতর চিন্তা করে নাই। ওইডাই আমার প্লাস পয়েন্ট। এইডা ক্যামোফ্লেজিং। এইরকম করতে হইব। এইডা আমি কোথা থেকে শিখছি? সৈন্যদের দ্যাখো। গায়ে জংলা পোশাক। মাথায় জংলা টুপি। ক্যান? টেররিস্টদের দ্যাখো। ফাঁকা ট্রেনের কামরায় একা একটা নিরীহ টিফিন বাক্স পইড়া আছে। দেইখা তোমার দুপুরের খাবারের কথা মনে পড়ব। মায়ের হাতের বানানো লুচি আলুর দম মনে পড়ব। আবার দ্যাখো, একটা ডাবল স্ট্যান্ডওয়ালা সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে কুরিয়ারের প্যাকেট। দেইখা তোমার চিঠির কথা মনে পড়ব। কিন্তু টিফিন কৌটায় লুচিও নাই, কুরিয়ারের প্যাকেটে চিঠিও নাই। কী আছে বলার জইন্য পুরস্কারও নাই। তোমার বাড়ির পাশে নতুন ফ্ল্যাটটায় যে ইয়ং ছেলেটা ভাড়া আসছে কয়েক মাস হইল, তুমি জানো সে সেলস ম্যান। আসলে বোমা বাঁধে। তোমারে বলবে ও? লালনের গান শুনো নাই? আপন সাধন কথা না কহিও যথা তথা। বেশ কিছু বছর আগে এক দুপুরে অরুণেশের একটি কবিতা পড়তে পড়তে হঠাৎই নীচের ভাবনাগুলো উপলব্ধি করি। কবিতাটির নাম ‘আমি ও ছায়াদি’।
আমি ও ছায়াদি : অ রু ণে শ ঘো ষ অস্পৃশ্য নদীর জলে একদিন গোধূলিবেলায় নত হয়ে ধুয়ে নেব খড়গ আমার তুমি সেইদিন ঝোপের আড়াল থেকে হেঁটে এসে একা বিকেলের নদীর আলোয় মুখোমুখি একান্তে দাঁড়াবে? অথবা পোশাক ছেড়ে ধীর পায়ে নেমে যাবে জলে আমি খড়গ তুলে নেব, আমি দুঃখ তুলে নেব বুকে তুমি নগ্ন তোমার পোশাক আমি দু-হাতে ভাসিয়ে দিয়ে যাব তুমি একা খেলা করো জলে।
১. একজন প্রকৃত কবি তাঁর নিজের জাত চেনাবার জন্যে একটিমাত্র শব্দকেই যথেষ্ট মনে করেন বোধয়। এক দুপুরে এই কবিতাটা পড়ছিলাম। প্রথমবার পড়তে গিয়ে, টের পাচ্ছিলাম কবিতার ভেতরে থাকা অসামান্য চিত্রনাট্যটা। কিন্তু দ্বিতীয়বারে, সে চিত্রনাট্য উধাও। পাঁচ নম্বর লাইন, ওই নিতান্ত নিরীহ পাঁচ নম্বর লাইন, ‘মুখোমুখি বসিবার’ জীবনানন্দ ঘেঁষা উচ্চারণকে পাশ কাটিয়ে তাকে এই কালের অনিশ্চয়তায় এনে ফেললেন অরুণেশ একটিমাত্র প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে ! জীবনানন্দ তো জানতেন, ‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার…’। অরুণেশের ‘কাল’ সেই প্রি-অক্যুপায়েড, সেই পূর্ব-জ্ঞান তাঁকে দেয়নি। সংশয় দিয়েছে। ঐ লাইন হয়তো আরো অনেক কবিই লিখে ফেলতে পারেন। ‘সময়ে’র শরিকতার কারণেই লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু ‘একান্তে দাঁড়াবে’-এর পরে প্রশ্নবোধক চিহ? এই একটা চিহ্নই যথেষ্ট কবির বুড়ো আঙুলের ছাপ চিনিয়ে দেওয়ার জন্যে। কেননা, ঐ লাইনে এই চিহ্নটা শুধু সময়ের কারণে প’ড়ে পাওয়া হতে পারে না। এটা কবিকে অর্জন করতে হয়েছে। সময়ের স্তন ছুঁয়ে নাভি ছুঁয়ে। জননেন্দ্রিয়ের গন্ধ শুঁকে। ‘ঝোপের আড়াল থেকে হেঁটে এসে একা/বিকেলের নদীর আলোয় মুখোমুখি একান্তে দাঁড়াবে’— এইখানে সাধারণ কবি আদেশ সূচক বাক্যই লিখবেন। অরুণেশ অনন্য সংশয়ের সন্ন্যাসী ছিলেন, এই বাক্যকে নিয়ে গেলেন প্রশ্নসূচকে। পেইন্টিঙে ব্যালান্স ব’লে একটা ব্যাপার আছে। কবিতাটার ‘খড়গ’-এর সাথে ‘?’-এর সেই ব্যালান্স, সংকেত ও ইশারা দেখিয়ে আমার মাথায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিলেন অরুণেশ।
২. এই কবিতার ‘ছায়াদি’কে আমি চিনি না। যিনি বা যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কি জানেন এঁকে? এঁকে আমি চিনি না বলেই চিনে ফেলার বন্দী-ফ্রেমের বাইরে গিয়ে অন্য কিছু আমি কল্পনা ক’রে নিতে পারছি। ধরা যাক, এই ছায়াদি কোনো মানুষের নামই নয়। অরুণেশ তাঁর নিজের ছায়ার কথাই বলেছেন এখানে। নিজের দ্বিতীয় সত্তার কথা। নিজের অপর লিঙ্গের কথা। তাহলে? তাহলে এই, যে,— হে তুমি আমার দ্বিতীয়/অপর সত্তা, হয় তুমি আমার মুখোমুখি এসে একান্তে দাঁড়াবে, নয়তো পোশাক ছেড়ে নেমে যাবে জলে। এবং যদি জলে নেমে গেলে, তবে তোমায় আমি মুক্তি দিলাম আমার যাবতীয় বন্ধন থেকে। ‘তোমার পোশাক’, যা আসলে আমারই পোশাক, আমার ছায়া হয়ে থাকার শেকল, তা’ ‘আমি দু-হাতে ভাসিয়ে দিয়ে যাব’। ‘তুমি একা খেলা করো জলে’। আমি তোমাকে হারানোর ‘দুঃখ তুলে নেব বুকে’। আজীবন যে অস্পৃশ্য জলে সাঁতরেছেন অরুণেশ, সে জলকে এড়িয়ে চলেছে সভ্য ভদ্র নাগরিক। অরুণেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন বেশ্যালয়, শুঁড়িখানায়, মর্গে, মৃতের মুখে বসা মাছির আস্তানায়। বাংলা মদের ঠেকে দেখেছেন অলৌকিক কবিসম্মেলন। স্বাভাবিক, এই জলেই তো অরুণেশ তাঁর খড়্গ ধোবেন। এই জলেই তো ছেড়ে দেওয়া যায় নিজের ছায়াকে। যাও ছায়া, এবারে তুমিও আমার মতো ভেসে বেড়াও, খেলা করো এই অস্পৃশ্য নদীর জলে। আমাকে ছাড়াই, একাই ঘুরে নাও এই নদীতে। তোমার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে ঘোরো। খেলা করো। প্রশ্ন হয় মনে, অরুণেশ কি চেতনার দ্বৈত-লিঙ্গ সত্তায় বিশ্বাস রাখতেন? যদি রেখে থাকেন, তবে তো এক সত্তা আরেককে ছেড়ে গেলে, কারুরই বাঁচার কথা নয়। এই ধাঁধার উত্তর পেতে অরুণেশের আরেকটি কবিতা দেখা যাক। এতক্ষণ আমি যা লিখলাম, সে-সবকিছুকে নীচের এই চার লাইনেই উনি বলে দিলেন। ‘আমি ও ছায়াদি’ কবিতাটির ২য় পর্বও কি ভাবা যেতে পারে নীচের এই কবিতাটিকে?
নদীতে শরীর স্পর্শ
সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নদীতে নেমেছ কি শতাব্দীর শূন্য রাত্রিবেলা? গোপনে গচ্ছিত থাক, মৃত্যু এসে মুছে দিক বিগত জন্মের কুয়াশা, সেই ভিন্ন এক অনুভূতি, নদী কি চুম্বন করেছে অণ্ডে? নয়, কেউ নয়, একা? হঠাৎ হয়েছে মনে, পুরুষটি মরে পড়ে আছে, পাশে স্ত্রীলোকের চুল বাঁধা।
৩. ভারতীয় অধিকাংশ দার্শনিক মার্গে ‘মৃত্যু’-কে বিয়োগ হিসেবে দেখা হয় না। এটা এই নীল রঙের গ্রহকে একটা বিরাট উপহার বৈকি, যেখানে মৃত্যু একটা যোগ চিহ্ন। এবং মৃত্যুকে একমাত্র যোগচিহ্ন দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব। ধরো, তোমার জীবন থেকে কেউ চলে গেল। ধরো তোমাদের বিচ্ছেদই হয়ে গেল। এটুকু বললে কিন্তু সত্যিই অসম্পূর্ণ বলা। আসলে তোমার জীবনে যোগ হ’ল তার চলে যাওয়া। তোমার জীবনে যোগ হ’ল তার না-থাকা। মৃত্যু একটা যোগ চিহ্নই। জীবনের সাথে যোগই তো হল আরেকটা চ্যাপ্টার। আমি যখন চলে যাব, তখন আমার মরে যাওয়া, আমার চলে যাওয়াটাও যোগ হ’ল আমার জীবনে। আরও একটা সংযোজন হল। এই মরে যাওয়া শুনলে আমার মনে পড়ছে অঘ্রাণের অনুভূতিমালা, মনে পড়ছে সেই লাইনগুলো, গাছ মরে গেলে যা পড়ে থাকে তা গাছ। পাখি মরে গেলে যা প’ড়ে থাকে, তা-ও পাখি, মৃত ব’লে অন্য কিছু নয়। একইভাবে মানুষের মন মরে গেলে যা থাকে, তা-ও মন। মৃত্যুর নিয়মে। মনে পড়ছে, রবি ঠাকুর, আষাঢ়। প্রবন্ধ। বস্তু থেকে অবকাশ চলে গেলে তখন তার মৃত্যু। বস্তু যখন যেটুকু, সেটুকু হয়েই থাকে তখন তার মৃত্যু।
৪. লেখাটা লিখতে লিখতেই মনে এল, অরুণেশের মৃত্যু। সেও তো জলেই। দক্ষ এক সাঁতারু কিভাবে বাড়ির পুকুরে তলিয়ে যান। রোজ যে পুকুরে তিনি নামেন, একদিন সেই পুকুরেই, সেই জলেই খড়্গ ধুতে নেমে তলিয়ে গেলেন। কোথায়? নিজের ছায়ার কাছেই? এবারে, পুনরায় পাঠ করা যাক ওপরের কবিতা দু’টি।
…….. অরুণেশ মারা গিয়েছিলেন বাড়ির পুকুরে স্নান করতে নেমে। ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ উপন্যাসে বঙ্কিম এ নিয়ে প্রশ্ন করছেন অরুণেশকে। পড়া যাক সেই অংশটিও। প্রাসঙ্গিক বলেই…
‘‘… রেললাইন পেরিয়ে রিকশা বাঁ-দিকের রাস্তায় ওঠে। দু-পাশে একতলা-দোতলা বাড়ি। গাছগাছালি। বঙ্কিম এসব দেখতে দেখতে অরুণেশকে বলেন, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব, কিছু মনে করবেন না তো?’ —‘কন্ না’ —‘আপনি তো শুনেছি খুব ভালো সাঁতার জানেন। জলে ডুবলেন কীভাবে—’ —‘দ্যাহেন, আত্মহনন হইতে আসে একডা ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। উইল পাওয়ার আর সেলফ কন্ট্রোল। যে সন্তরণ জানে না, তার নিজের হাতে তো কিসুই নাই। ডুইবা যাওন তার নিয়তি নির্ধারিত। ভাইসা থাকন তার দ্বারা সম্ভব না। আমি সন্তরণ বিদ্যা জানি। যহন আমার ডুইবা যাওন দরকার তহন সন্তরণ বিদ্যার কৌশল প্রয়োগ না কইরা ডুইবা যাওনের ইচ্ছাশক্তি আমার আছে। মাইনষে খালি ইচ্ছাডারে দ্যাহে। তার পিছনে থাকা শক্তিডারে দ্যাহে না।’ …’’
ঘোষবর্ণ অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
বেশ কিছু বছর আগে কোচবিহারে কবি পাপড়ি গুহনিয়োগীর বাড়িতে ওঁদের পত্রিকার নাম নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম অরুণেশের পত্রিকার নামের কথা। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার নাম ছিল ‘জিরাফ’। সংকেত, ইঙ্গিত ও গূঢ়তাবাহী একটি নাম। এমন একটি প্রাণী জিরাফ, যে বোবা। নখ নেই, ধার নেই, আক্রমণ নেই, গতি নেই, শান্ত। কিন্তু মাথা সবার ওপরে। উঁচু। সিস্টেমের ভেতর আপাত নিরীহ হয়ে বসে, সমস্ত নজরদারি টপকে পালটা নজরদারির কথাই যেন ভাবায় জিরাফের ওই উঁচু মাথা। অরুণেশের কথা হলে আমি সবসময়েই ওঁর বিস্ময়কর গল্পগুলোর কথা বলি। ‘পমি আয়নায়’, ‘মদ ও মেয়েমানুষ’, ‘কমরেড কেরুকে কেউ চিঠি লেখে না’, ‘মেয়েরাই বাঁচায়’, এরকম সব আন্তর্জাতিক মানের গল্প লিখেছেন উনি। যে গল্পে পালিশ নেই, এরকম একটা ভাষায় লিখতেন। যেন ধক করে মুখ দিয়ে কলজেটা বেরিয়ে পড়ে রয়েছে এক-একটা গল্পের পাতায়। আমার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ উপন্যাসে অনেক বড়ো একটা জায়গাজুড়ে ওঁর উপস্থিতি। সেখানে অরুণেশ যা করেছেন তা একমাত্র অরুণেশের পক্ষেই সম্ভব। ‘অরুণেশের অরুণেশগুলো’ নামে আমার একটি গল্প রয়েছে ‘ডি মেজর’ গল্প সংকলনে, যেখানে তিনি শরীরের প্রতিটি অংশ বিছানায় গয়নার মতো খুলে রাখছেন, যুদ্ধের রাতে সৈনিক যেভাবে তাঁবুর ভেতর অস্ত্র পেতে রাখে। অরুণেশ বলতেন, অর্জুন, তুমি কী তা কাউকে কোনও দিনও জানতে দিবা না। যদি দাও, তাইলে এই চাউটাল মালগুলা একদিন তোমারে কনভিনস করায়া তোমারে দিয়াই বলায়া নিবে যে তোমার মইধ্যে কোনও ট্যালেন্ট নাই। তুমি একটা ভুসি মাল। বাঙ্গি। বাঙ্গি বুঝো? কলকাতার লোকে যারে কয় খরমুজ। নিজের দশ বারোটা চেহারা তৈরি করো। তোমার আসল তুমিটার কেউ য্যান নাগালই না পায়। কেউ ভাববে এইডা তুমি, কেউ ভাববে ওইডা। ক্যামোফ্লেজ করো। তারপর বলতেন, আমি একটা পত্রিকা করতাম, বুঝলা। পত্রিকার নাম ছিল গিয়া জিরাফ। তা, জিরাফ ক্যান? জিরাফের দ্যাখো ভয়েস নাই। বোবা। হে রাষ্ট্র, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, আমার মুখ দিয়া টু শব্দও বাইর হইব না। জিরাফের দাঁত নখ থাবা কিসুই নাই। কিন্তু শির উচ্চ। সিস্টেম আর রাষ্ট্রের এত এত চোখ আর ক্যামেরার মইধ্যেও আমি গোবেচারা ভোলেভালা সাইজা সবার উপরে মাথা রাইখা সিস্টেমের উপরেই নজর চালাইতেসি। আমি যে বোবা। আমার যে নখ দাঁত থাবা নাই। তাই রাষ্ট্র আমারে অত পাত্তা দেয় নাই। আমারে নিয়া গুরুতর চিন্তা করে নাই। ওইডাই আমার প্লাস পয়েন্ট। এইডা ক্যামোফ্লেজিং। এইরকম করতে হইব। এইডা আমি কোথা থেকে শিখছি? সৈন্যদের দ্যাখো। গায়ে জংলা পোশাক। মাথায় জংলা টুপি। ক্যান? টেররিস্টদের দ্যাখো। ফাঁকা ট্রেনের কামরায় একা একটা নিরীহ টিফিন বাক্স পইড়া আছে। দেইখা তোমার দুপুরের খাবারের কথা মনে পড়ব। মায়ের হাতের বানানো লুচি আলুর দম মনে পড়ব। আবার দ্যাখো, একটা ডাবল স্ট্যান্ডওয়ালা সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে কুরিয়ারের প্যাকেট। দেইখা তোমার চিঠির কথা মনে পড়ব। কিন্তু টিফিন কৌটায় লুচিও নাই, কুরিয়ারের প্যাকেটে চিঠিও নাই। কী আছে বলার জইন্য পুরস্কারও নাই। তোমার বাড়ির পাশে নতুন ফ্ল্যাটটায় যে ইয়ং ছেলেটা ভাড়া আসছে কয়েক মাস হইল, তুমি জানো সে সেলস ম্যান। আসলে বোমা বাঁধে। তোমারে বলবে ও? লালনের গান শুনো নাই? আপন সাধন কথা না কহিও যথা তথা। বেশ কিছু বছর আগে এক দুপুরে অরুণেশের একটি কবিতা পড়তে পড়তে হঠাৎই নীচের ভাবনাগুলো উপলব্ধি করি। কবিতাটির নাম ‘আমি ও ছায়াদি’।
আমি ও ছায়াদি : অ রু ণে শ ঘো ষ অস্পৃশ্য নদীর জলে একদিন গোধূলিবেলায় নত হয়ে ধুয়ে নেব খড়গ আমার তুমি সেইদিন ঝোপের আড়াল থেকে হেঁটে এসে একা বিকেলের নদীর আলোয় মুখোমুখি একান্তে দাঁড়াবে? অথবা পোশাক ছেড়ে ধীর পায়ে নেমে যাবে জলে আমি খড়গ তুলে নেব, আমি দুঃখ তুলে নেব বুকে তুমি নগ্ন তোমার পোশাক আমি দু-হাতে ভাসিয়ে দিয়ে যাব তুমি একা খেলা করো জলে।
১. একজন প্রকৃত কবি তাঁর নিজের জাত চেনাবার জন্যে একটিমাত্র শব্দকেই যথেষ্ট মনে করেন বোধয়। এক দুপুরে এই কবিতাটা পড়ছিলাম। প্রথমবার পড়তে গিয়ে, টের পাচ্ছিলাম কবিতার ভেতরে থাকা অসামান্য চিত্রনাট্যটা। কিন্তু দ্বিতীয়বারে, সে চিত্রনাট্য উধাও। পাঁচ নম্বর লাইন, ওই নিতান্ত নিরীহ পাঁচ নম্বর লাইন, ‘মুখোমুখি বসিবার’ জীবনানন্দ ঘেঁষা উচ্চারণকে পাশ কাটিয়ে তাকে এই কালের অনিশ্চয়তায় এনে ফেললেন অরুণেশ একটিমাত্র প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে ! জীবনানন্দ তো জানতেন, ‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার…’। অরুণেশের ‘কাল’ সেই প্রি-অক্যুপায়েড, সেই পূর্ব-জ্ঞান তাঁকে দেয়নি। সংশয় দিয়েছে। ঐ লাইন হয়তো আরো অনেক কবিই লিখে ফেলতে পারেন। ‘সময়ে’র শরিকতার কারণেই লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু ‘একান্তে দাঁড়াবে’-এর পরে প্রশ্নবোধক চিহ? এই একটা চিহ্নই যথেষ্ট কবির বুড়ো আঙুলের ছাপ চিনিয়ে দেওয়ার জন্যে। কেননা, ঐ লাইনে এই চিহ্নটা শুধু সময়ের কারণে প’ড়ে পাওয়া হতে পারে না। এটা কবিকে অর্জন করতে হয়েছে। সময়ের স্তন ছুঁয়ে নাভি ছুঁয়ে। জননেন্দ্রিয়ের গন্ধ শুঁকে। ‘ঝোপের আড়াল থেকে হেঁটে এসে একা/বিকেলের নদীর আলোয় মুখোমুখি একান্তে দাঁড়াবে’— এইখানে সাধারণ কবি আদেশ সূচক বাক্যই লিখবেন। অরুণেশ অনন্য সংশয়ের সন্ন্যাসী ছিলেন, এই বাক্যকে নিয়ে গেলেন প্রশ্নসূচকে। পেইন্টিঙে ব্যালান্স ব’লে একটা ব্যাপার আছে। কবিতাটার ‘খড়গ’-এর সাথে ‘?’-এর সেই ব্যালান্স, সংকেত ও ইশারা দেখিয়ে আমার মাথায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিলেন অরুণেশ।
২. এই কবিতার ‘ছায়াদি’কে আমি চিনি না। যিনি বা যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কি জানেন এঁকে? এঁকে আমি চিনি না বলেই চিনে ফেলার বন্দী-ফ্রেমের বাইরে গিয়ে অন্য কিছু আমি কল্পনা ক’রে নিতে পারছি। ধরা যাক, এই ছায়াদি কোনো মানুষের নামই নয়। অরুণেশ তাঁর নিজের ছায়ার কথাই বলেছেন এখানে। নিজের দ্বিতীয় সত্তার কথা। নিজের অপর লিঙ্গের কথা। তাহলে? তাহলে এই, যে,— হে তুমি আমার দ্বিতীয়/অপর সত্তা, হয় তুমি আমার মুখোমুখি এসে একান্তে দাঁড়াবে, নয়তো পোশাক ছেড়ে নেমে যাবে জলে। এবং যদি জলে নেমে গেলে, তবে তোমায় আমি মুক্তি দিলাম আমার যাবতীয় বন্ধন থেকে। ‘তোমার পোশাক’, যা আসলে আমারই পোশাক, আমার ছায়া হয়ে থাকার শেকল, তা’ ‘আমি দু-হাতে ভাসিয়ে দিয়ে যাব’। ‘তুমি একা খেলা করো জলে’। আমি তোমাকে হারানোর ‘দুঃখ তুলে নেব বুকে’। আজীবন যে অস্পৃশ্য জলে সাঁতরেছেন অরুণেশ, সে জলকে এড়িয়ে চলেছে সভ্য ভদ্র নাগরিক। অরুণেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন বেশ্যালয়, শুঁড়িখানায়, মর্গে, মৃতের মুখে বসা মাছির আস্তানায়। বাংলা মদের ঠেকে দেখেছেন অলৌকিক কবিসম্মেলন। স্বাভাবিক, এই জলেই তো অরুণেশ তাঁর খড়্গ ধোবেন। এই জলেই তো ছেড়ে দেওয়া যায় নিজের ছায়াকে। যাও ছায়া, এবারে তুমিও আমার মতো ভেসে বেড়াও, খেলা করো এই অস্পৃশ্য নদীর জলে। আমাকে ছাড়াই, একাই ঘুরে নাও এই নদীতে। তোমার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে ঘোরো। খেলা করো। প্রশ্ন হয় মনে, অরুণেশ কি চেতনার দ্বৈত-লিঙ্গ সত্তায় বিশ্বাস রাখতেন? যদি রেখে থাকেন, তবে তো এক সত্তা আরেককে ছেড়ে গেলে, কারুরই বাঁচার কথা নয়। এই ধাঁধার উত্তর পেতে অরুণেশের আরেকটি কবিতা দেখা যাক। এতক্ষণ আমি যা লিখলাম, সে-সবকিছুকে নীচের এই চার লাইনেই উনি বলে দিলেন। ‘আমি ও ছায়াদি’ কবিতাটির ২য় পর্বও কি ভাবা যেতে পারে নীচের এই কবিতাটিকে?
নদীতে শরীর স্পর্শ
সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নদীতে নেমেছ কি শতাব্দীর শূন্য রাত্রিবেলা? গোপনে গচ্ছিত থাক, মৃত্যু এসে মুছে দিক বিগত জন্মের কুয়াশা, সেই ভিন্ন এক অনুভূতি, নদী কি চুম্বন করেছে অণ্ডে? নয়, কেউ নয়, একা? হঠাৎ হয়েছে মনে, পুরুষটি মরে পড়ে আছে, পাশে স্ত্রীলোকের চুল বাঁধা।
৩. ভারতীয় অধিকাংশ দার্শনিক মার্গে ‘মৃত্যু’-কে বিয়োগ হিসেবে দেখা হয় না। এটা এই নীল রঙের গ্রহকে একটা বিরাট উপহার বৈকি, যেখানে মৃত্যু একটা যোগ চিহ্ন। এবং মৃত্যুকে একমাত্র যোগচিহ্ন দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব। ধরো, তোমার জীবন থেকে কেউ চলে গেল। ধরো তোমাদের বিচ্ছেদই হয়ে গেল। এটুকু বললে কিন্তু সত্যিই অসম্পূর্ণ বলা। আসলে তোমার জীবনে যোগ হ’ল তার চলে যাওয়া। তোমার জীবনে যোগ হ’ল তার না-থাকা। মৃত্যু একটা যোগ চিহ্নই। জীবনের সাথে যোগই তো হল আরেকটা চ্যাপ্টার। আমি যখন চলে যাব, তখন আমার মরে যাওয়া, আমার চলে যাওয়াটাও যোগ হ’ল আমার জীবনে। আরও একটা সংযোজন হল। এই মরে যাওয়া শুনলে আমার মনে পড়ছে অঘ্রাণের অনুভূতিমালা, মনে পড়ছে সেই লাইনগুলো, গাছ মরে গেলে যা পড়ে থাকে তা গাছ। পাখি মরে গেলে যা প’ড়ে থাকে, তা-ও পাখি, মৃত ব’লে অন্য কিছু নয়। একইভাবে মানুষের মন মরে গেলে যা থাকে, তা-ও মন। মৃত্যুর নিয়মে। মনে পড়ছে, রবি ঠাকুর, আষাঢ়। প্রবন্ধ। বস্তু থেকে অবকাশ চলে গেলে তখন তার মৃত্যু। বস্তু যখন যেটুকু, সেটুকু হয়েই থাকে তখন তার মৃত্যু।
৪. লেখাটা লিখতে লিখতেই মনে এল, অরুণেশের মৃত্যু। সেও তো জলেই। দক্ষ এক সাঁতারু কিভাবে বাড়ির পুকুরে তলিয়ে যান। রোজ যে পুকুরে তিনি নামেন, একদিন সেই পুকুরেই, সেই জলেই খড়্গ ধুতে নেমে তলিয়ে গেলেন। কোথায়? নিজের ছায়ার কাছেই? এবারে, পুনরায় পাঠ করা যাক ওপরের কবিতা দু’টি।
…….. অরুণেশ মারা গিয়েছিলেন বাড়ির পুকুরে স্নান করতে নেমে। ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ উপন্যাসে বঙ্কিম এ নিয়ে প্রশ্ন করছেন অরুণেশকে। পড়া যাক সেই অংশটিও। প্রাসঙ্গিক বলেই…
‘‘… রেললাইন পেরিয়ে রিকশা বাঁ-দিকের রাস্তায় ওঠে। দু-পাশে একতলা-দোতলা বাড়ি। গাছগাছালি। বঙ্কিম এসব দেখতে দেখতে অরুণেশকে বলেন, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব, কিছু মনে করবেন না তো?’ —‘কন্ না’ —‘আপনি তো শুনেছি খুব ভালো সাঁতার জানেন। জলে ডুবলেন কীভাবে—’ —‘দ্যাহেন, আত্মহনন হইতে আসে একডা ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। উইল পাওয়ার আর সেলফ কন্ট্রোল। যে সন্তরণ জানে না, তার নিজের হাতে তো কিসুই নাই। ডুইবা যাওন তার নিয়তি নির্ধারিত। ভাইসা থাকন তার দ্বারা সম্ভব না। আমি সন্তরণ বিদ্যা জানি। যহন আমার ডুইবা যাওন দরকার তহন সন্তরণ বিদ্যার কৌশল প্রয়োগ না কইরা ডুইবা যাওনের ইচ্ছাশক্তি আমার আছে। মাইনষে খালি ইচ্ছাডারে দ্যাহে। তার পিছনে থাকা শক্তিডারে দ্যাহে না।’ …’’