‘ভারতীয় নোটবুক’ পড়ে লেখক মৃণাল শতপথী-র প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। কয়েকদিন আগে রাতের দিকে মৃণাল ফোন করেছিলেন। যদিও তাঁর মতে ‘এখানে (টেলিফোনে) সেভাবে আলোচনা হয়নি’ এবং ‘এই আলোচনা অসংলগ্ন’। তবু আমি এই আলোচনা প্রকাশ্যে আনলাম, কারণ সভ্যতার বায়ুদূষণের মতো এই অসংলগ্নতাও অমোঘ।
‘‘…
আপনাকে পাঠ করতে গেলে অনেক কনসেনট্রেশন দরকার এবং অনেক রকমের বিষয় আবিষ্কার করতে করতে যাওয়াও হয়, ফলে এক কথায় একটি অসাধারণ উপন্যাস পড়লাম বা উপন্যাসটি আমার ভালো লাগেনি, এরকম ধরনের কথা বলব না। এই উপন্যাস পড়ার পরে আমার প্রাথমিক বিস্ময় যেটা হয়েছে, আপনার আগের লেখাপত্রেও আমি দেখেছি, যে, ভাবনাকে যেন আপনি লাগাম পরিয়ে দিয়েছেন। ‘ভারতীয় নোটবুক’-কে আমি রাজনৈতিক উপন্যাসই বলব এবং নোটবুক হিসেবে স্ট্রাকচারটা তৈরি হয়েছে, একদম নোটবুক বলাই যায় সেটাকে। প্রতিটি পৃষ্ঠায় যেভাবে আপনি ভাবনার লজিক, সেটা যেন পাতায় পাতায়। একটা মোনোলগের মতো করেই এসছে। সেটা আমি যখন পড়ছি তখন কোনও ভাবনা এত গভীরভাবে ডুবিয়ে নিতে পারে ভেতরে, আমার ভেতরে সেঁধিয়ে যেতে পারে। এই যে স্ট্রাকচারটা আপনি নিয়েছেন, ভাবনা থেকে একেকটা অদ্ভুত আশ্চর্য ইমেজারি তৈরি হচ্ছে, এবং সে ভাঙছে, গড়ছে, একটা মানুষের পজেটিভিটি, নেগেটিভিটি, যেভাবে আসছে, এবং যে দ্বন্দ্বটা তৈরি হচ্ছে, বন্ধুর সঙ্গে, স্ত্রীর সঙ্গে। আপাতভাবে নিরীহ একটা প্লট, যদিও এটা প্লট নির্ভর লেখা নয়, এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে যেগুলো এককথায় বললে চেনা বিষয়। কিন্তু এই চেনা প্রেক্ষাপটের মধ্যে যে চরিত্রগুলো আসছে, তারা তাদের যে ভাবনাগুলো নিয়ে আসছে, যেভাবে ব্যাখ্যা করছে, এই জায়গা থেকে আমার কাছে এটা বিস্ময়কর লেগেছে। ভাবনার এই বৃত্তের মধ্যে আমি ডুবেছিলাম। আমাদের দেশের সমস্যা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সেখানে ব্যক্তি-মানুষের দ্বন্দ্ব, সে নিজে লেখক, এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষে বিজয় দিবসে জন্মের কারণে তার নাম বিজয়, এই যে এক অদ্ভুত আয়রনি তৈরি হল, পুরো উপন্যাসে, সে কিন্তু কোনও কাহিনির ধার ধারল না, কাহিনি কোথাও ছেড়ে যাচ্ছে, কোথাও জুড়ে যাচ্ছে, এইভাবেই গেছে। কিন্তু সংলাপগুলো, নিজের সঙ্গে, স্ত্রীর সঙ্গে, বন্ধুর সঙ্গে এবং ওই যে ভাস্কর মকবুল, এই চরিত্রটি আপনার এই উপন্যাসে অনবদ্য।
এই উপন্যাস শেষ করার পর আমার মনে হয়েছে, ভাবনাকে যেভাবে পাতায় পাতায় রাখা হয়েছে, এবং এখানে তো একটা পাঠ-অভিজ্ঞতাও রয়েছে, সেখান থেকে বিস্ময়কর একেকটা লাইনও উঠে আসছে, আমার মনে হচ্ছে, কিছু লাইন টুকে টুকে রাখি, যে দর্শনগুলো উঠে এসছে আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিলব্ধ জায়গা থেকে; এবং একটার সঙ্গে আরেকটা কীভাবে মিশে যাচ্ছে, সাধারণ লোটে মাছের একটা রান্না, সেটা কীভাবে জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ছে, আশ্চর্য ইমেজারি হয়ে পড়ছে, এরকম অজস্র এসছে, এইটা আমাকে ধাক্কা দিল।
এখানে গদ্যের এমন অসামান্য আকর্ষণ আছে, যেখানে এত কথা হলেও, ভাবনার এত বিস্তার হলেও সে ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে না। এই কাজ আপনার শ্রেষ্ঠ কাজ আমি বলব না। কিন্তু মনে হল যেন শ্রেষ্ঠ কোনও কাজের আগের ধাপ আপনি পেরোলেন এই লেখার মধ্যে। এই জটিল একটা বাস্তবতা, সেটাকে আপনি যে শব্দের নৈপুণ্যে ধরছেন, প্রত্যেকটা জায়গায়। খুব নিরীহ কিছু ঘটনা আপনি বর্ণনা করেছেন, কিন্তু সেই নিরীহ ঘটনার মধ্যে দিয়ে যে জীবন দর্শনগুলো আপনি এনেছেন, সেটা অদ্ভুত!
এখানে ঝড়ের প্রসঙ্গটা যেভাবে এসছে, আবহাওয়া দপ্তরের ভাষায়, বারেবারে ফিরে ফিরে আসছে, কিংবা শেষের দিকে যত যাচ্ছি, যেখানে অশরীরী প্রসঙ্গটা অদ্ভুতভাবে এল, মানুষ যে মরেই আছে আসলে, আপনার যেটা বিশেষত্ব, আপনি একেবারেই গতানুগতিক যে থট, আপনি অন্য অ্যাঙ্গলে বসে সেটাকে দেখছেন। হয়ত চিন্তাটা একই, কিন্তু আপনি সেটাকে দেখছেন একেবারে আপনার মতো করে। এখানে প্রাপ্তি হয়েছে এর দর্শনটা। চান বা না চান, এখানে একটা প্লটের কাঠামো রয়েইছে, আপনি সেটা কন্টিনিউ করেননি, কোথাও ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু এক ধরনের কোঅর্ডিনেশন আমি পেয়েছি। যেখানে একটা ব্যক্তি-মানুষ, সে একটা নাম নিয়ে চলে, যেটা একটা গৌরবজনক নাম, আজকের ভারতে তার যে অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে, এই যে টানাপোড়েনটা, ফারুকের প্রসঙ্গ যখন এল, তার সংগ্রামের চিন্তা, যদিও ফারুকের লড়াইয়ের পদ্ধতির সঙ্গে আমার নিজের ভাবনার ভিন্নমত রয়েছে, কিন্তু তাদের লড়াইয়ের ডেডিকেশনে তো কোনও ডিজঅনেস্টি নেই; কিন্তু আমি বলছি একজন মধ্যবিত্ত মানুষ, যে একজন লেখক, লিখে নাম করা থেকে শুরু করে অর্থবান হওয়া, এবং ক্রমশ যে মানুষগুলোর সঙ্গে ছিল তাদের থেকে দূরত্ব তৈরি হওয়া, এবং একটা সময় মৃত বন্ধুর জন্য অবিচুয়ারিটা লিখতেও তার বাধা হচ্ছে, আগে লুকোতে হত বন্দুক, এখন কলম লুকোতে হচ্ছে, এত আশ্চর্যভাবে এত রাজনৈতিক এই উপন্যাস। কতটা পাঠকপ্রিয়তা পাবে এই উপন্যাস আমি জানি না। কিন্তু যারা সিরিয়াস পাঠক, যাঁরা ভাবনার এই বিস্তারকে বিস্ময়ে দেখবেন, তাঁদের সঙ্গে আমিও একই দলে থাকব।
আপনার লেখা পড়া মানে একটা নতুন দিক জানা। আপনার লেখা যেভাবে শুরু হয় শেষ হয়, সামগ্রিকভাবে তার যে ধরন, তার সঙ্গে আমি একমত হই না হই, আমাকে যেটা বিস্মিত করে, এত গভীরে আপনি ভাবনাকে নিয়ে যেতে পারেন এবং যেখানে প্রত্যেকটা ভাবনা লজিক্যাল, সেখানে কোথাও আনসায়েন্টেফিক কথা আপনি আনছেন না, উদ্ভ্রান্ত প্রলাপের মতো সেগুলো ঘটছে না, আপাতদৃষ্টিতে সেটা মনে হলেও, যে এটা ব্যক্তি মানুষের প্রলাপের মতো, কিন্তু আসলে সেটা সেরকম নয়। তার মধ্যে খুব সূক্ষ্ম লজিক আপনি ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন, এটা পাঠকের খুব বড় পাওনা। এই লেখা আমাকে নানাদিক থেকে নাড়িয়েছে। ফর্ম নিয়ে তো আপনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই থাকেন সব লেখায়, কিন্তু তার থেকে আমি বলব আপনার ভাবনার বিস্তার। এবং আজকের ভারতে এই উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতা। দেশের যে পরিস্থিতি, সেই জায়গা থেকে। নানান প্রতীকী জায়গা থেকে টানাপোড়েন উঠে আসছে, ব্যক্তি-মানুষের দ্বন্দ্ব, লেখকের দ্বন্দ্ব, এই সবটা আপনি যেভাবে এনেছেন, নোটস আকারে, অদ্ভুত, অনবদ্য…
…’’
(অনুলিখনে মুখের কথার চলন যতদূর সম্ভব অনুসরণ করা হয়েছে।)
Leave a Reply