আমার নিজের তা কখনও মনে হয় না যে আমি ছবির মানুষ—আঁকার অর্থে তো নয়ই। আমি মূলত লেখামানুষ। শব্দই আমার উপাদান, বাক্যই আমার উপকরণ। আমি ছবি আঁকি না ছবি আঁকার জন্য। আঁকি তখনই, যখন একটি লেখা আমার ভিতরে জট পাকিয়ে বসে থাকে, যখন বাক্যগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যখন পথ হারিয়ে ফেলি। তখন আমি কাগজে দাগ কাটি—রেখা, ছায়া, কিছু অনির্দিষ্ট আকার। যেন লেখার মেজাজটা স্পর্শ করতে পারি। যেন ভাষার আগে যে অন্ধকার, তার মানচিত্র একটু আঁচ করা যায়।
আমি জানি, এটা কোনও আলাদা শিল্পচর্চা নয়। এটা পথ খোঁজার কৌশল। যেমন Coetzee নাকি লেখায় আটকে গেলে কাঠের কাজ করতেন—হাতুড়ি, কাঠ, মাপজোক; শব্দের বদলে বস্তু। যেমন Henry Miller হঠাৎ টেবিল ছেড়ে কেটে পড়তেন—হাঁটতে, ঘুরতে। যেমন মারকেস দরজা-জানলায় রং করতেন—এক ধরনের মনোসংযোগ, যেখানে গল্পের ভেতরের রঙ ধীরে ধীরে বাইরের রঙে মিশে যায়।
এসবই আসলে একই ব্যাপার। লেখার বাইরে গিয়ে লেখার দিকেই ফেরা। নিজের ভিতরের আটকে যাওয়া স্রোতটাকে অন্য খাতে বইয়ে দেওয়া। আমি যখন আঁকি, তখনও লিখি—কেবল শব্দ ছাড়া। রেখাগুলো আমার বাক্যের খসড়া। ছায়াগুলো অনুচ্চারিত অনুচ্ছেদ। যে মুখটা ঠিক করে উঠতে পারে না, সেটাই হয়তো কোনও চরিত্রের দ্বিধা। যে ফাঁকা জায়গাটা রয়ে যায়, সেটাই হয়তো গল্পের নিঃশ্বাস।
আমি আঁকি না শিল্পী হওয়ার জন্য। আঁকি লেখক হয়ে উঠতে। আঁকি কারণ ভাষা কখনও কখনও আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, আর তখন হাত আগে পৌঁছে যায়, মাথার আগে। আঁকি, কারণ পথ হারালে মানচিত্র নয়, দিকের অনুভূতিটাই দরকার।
এর বেশি কিছু নয়।
Leave a Reply