ভাষা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জগতের নিয়মতন্ত্রে শুধু একটি মাধ্যম নয়—তা ক্ষমতারও একটি কাঠামো। তা ক্ষমতার প্রযুক্তি। আধুনিক রাষ্ট্র এই সত্যটি খুব ভালো বোঝে। তাই আজ ভাষা মানে কেবল শব্দ বা বাক্য নয়; ভাষা মানে ডেটা, কোড, ক্যাটাগরি। কে কী বলছে, কখন বলছে, কোথায় বলছে—এই সবই নজরদারির কাঠামোর ভেতরে পড়ে।
আমরা যে বাস্তবকে দেখি, বুঝি, গ্রহণ করি বা প্রত্যাখ্যান করি, সেই পুরো প্রক্রিয়াটাই ভাষার ভেতর দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। ভাষা তাই নিরপেক্ষ নয়। ভাষা সিদ্ধান্ত নেয় কোনটা দৃশ্যমান হবে, কোনটা অদৃশ্য থাকবে; কোন অনুভব বৈধ, কোনটা অপ্রয়োজনীয়। ফলে ভাষার স্ট্রাকচারকে প্রশ্ন করা মানে কেবল দর্শনের অনুশীলন নয়—তা রাজনীতির একেবারে কেন্দ্রে গিয়ে দাঁড়ানো।
এই প্রশ্ন করার পথও ইতিহাসে দু’টি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত। একটি পাশ্চাত্য, লোগোসেন্ট্রিক ধারা—যেখানে চিহ্ন, প্রতীক এবং ধারণা বাস্তবের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। আরেকটি প্রাচ্য, ভার্বসেন্ট্রিক ধারা—যেখানে ক্রিয়া, অনুশীলন এবং জীবন নিজেই অর্থ উৎপাদন করে। এই বিভাজন নিছক তাত্ত্বিক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্র, বাজার এবং ক্ষমতার গঠন।
পাশ্চাত্য লোগোসেন্ট্রিক ধারায় ‘অ্যাপিয়ারেন্স’ আর ‘রিয়েলিটি’র মধ্যে একটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা হয়। চিহ্ন সেখানে প্রতিনিধি—সে বাস্তবের জায়গা নেয় না, তাকে প্রশ্নও করে না। ঠিক এই কারণেই চিহ্নকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তারিখ, নাম, প্রতীক, দিবস—সবকিছুই এখানে শাসনযোগ্য। ধরা যাক, ১৪ ফেব্রুয়ারি। ভ্যালেন্টাইন্স ডে। একটি তারিখকে প্রেমের প্রতিনিধি বানিয়ে দেওয়া হল। প্রেম আর বিস্তার নয়—সে বন্দি হল ক্যালেন্ডারের একটি ঘরে।
এইখানেই লোগোসেন্ট্রিক ধারার রাজনৈতিক কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়। চিহ্ন, প্রতীক, সিম্বল—এই সবকিছুই গণনাযোগ্য। তারিখ আছে, দিবস আছে, স্লোগান আছে, হ্যাশট্যাগ আছে। রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট শক্তি এই চিহ্নগুলিকেই সবচেয়ে সহজে ধরতে পারে, ট্র্যাক করতে পারে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রেম যদি হয় ‘১৪ ফেব্রুয়ারি’, প্রতিবাদ যদি হয় ‘একটি নির্দিষ্ট দিন’, সংস্কৃতি যদি হয় ‘একটি উৎসব’—তাহলে সেগুলোকে অনুমতি দেওয়া যায়, নিয়ন্ত্রণ করা যায়, প্রয়োজনে নিষিদ্ধও করা যায়।
এটাই নজরদারির রাজনীতি। অনুভবকে যদি প্রতীকে নামিয়ে আনা যায়, তাহলে তাকে ডেটায় পরিণত করা যায়। ডেটা মানে শক্তি। আজকের রাষ্ট্র আর নাগরিকের জীবনে ঢুকে পড়ে না—নাগরিকের জীবন নিজেই রাষ্ট্রের ভেতরে নথিভুক্ত হয়ে যায়। প্রেম কাকে করছ, কোন গান শুনছ, কোন উৎসব পালন করছ, কোন ভাষায় কথা বলছ—সবই পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। আর পরিচয় মানেই সন্দেহের সম্ভাবনা।
এইখানেই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ভাষার যোগ। আধুনিক জাতীয়তাবাদ কোনও বহুত্ব সহ্য করতে পারে না। সে চায় এক ভাষা, এক সংস্কৃতি, এক আবেগ, এক ইতিহাস। ফলে সংস্কৃতিকে সে পবিত্র করে তোলে—কিন্তু সেই পবিত্রতা জীবন্ত নয়, প্রদর্শনযোগ্য। উৎসব হয়, কিন্তু ঋতু হয় না। দিবস হয়, কিন্তু প্রবাহ হয় না। সংস্কৃতি এখানে অনুশীলন নয়—ইভেন্ট।
সংস্কৃতির এই ইভেন্টায়নই পণ্যায়নের পথ খুলে দেয়। বসন্ত আর ঋতু থাকে না—সে হয়ে ওঠে ‘থিম’। প্রেম আর সম্পর্ক থাকে না—সে হয়ে ওঠে ‘কনটেন্ট’। গান, কবিতা, উৎসব—সবকিছুই বিক্রির যোগ্য হয়ে ওঠে, যতক্ষণ না তারা প্রশ্ন তোলে। প্রশ্ন তুললেই তারা ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘অসংস্কৃত’, ‘বিপজ্জনক’।
লোগোসেন্ট্রিক কাঠামো এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সহায়ক। কারণ চিহ্ন ভাঙা যায়, প্রতীক বদলানো যায়, নাম পাল্টানো যায়। একটি দিবস নিষিদ্ধ করা যায়। একটি স্লোগান অপরাধ বানানো যায়। একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে অন্য ভাষাগুলিকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য করা যায়।
এই বন্দিত্বের রাজনীতি খুব পরিচিত। তারিখ বানানো হল, তারপর সেই তারিখের চারপাশে তৈরি হল একাধিক আনুষঙ্গিক প্রতীক—রোজ় ডে, টেডি বিয়ার ডে, প্রমিস ডে, হাগ ডে। প্রতিটি ধাপ এক একটি পণ্যের সঙ্গে বাঁধা। প্রেম এখানে আর সম্পর্কের গভীরতা নয়; সে একটি ক্রমবিন্যস্ত ভোগ্য অভ্যাস। বাজার ঠিক করে দেয় কোন দিনে কী অনুভব করা উচিত, কী কেনা উচিত, আর কোন অনুভব অপ্রাসঙ্গিক।
এখানে লোগোই শাসক। প্রতীকই নিয়ন্ত্রক। এই কাঠামোর ভেতরে অনুভব যত বেশি বিমূর্ত হবে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা তত সহজ হবে। পুঁজিবাদ ঠিক এই বিমূর্ততার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। প্রেম, শোক, স্মৃতি, এমনকি প্রতিবাদ—সবকিছুকেই সে সিম্বলে পরিণত করে, যাতে সেগুলো বিপণনযোগ্য হয়, নিরাপদ হয়, ব্যবস্থার ভেতরে থাকে।
এর উলটো দিকে প্রাচ্য ভার্বসেন্ট্রিক পথ। এখানে ভাষা জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেয় না; ভাষা জীবনেই মিশে থাকে। ক্রিয়া এখানে শুধু বাক্যের অংশ নয়—সে ইতিহাসের চালিকাশক্তি। ফলে এখানে অনুভবকে আলাদা করে প্রতীকে বন্দি করার দরকার পড়ে না। প্রেম কোনও দিন নয়, কোনও অনুষ্ঠান নয়। সে ঋতু। বসন্ত।
একটা ঋতুকে বাজারজাত করা কঠিন। বসন্তকে কোনও ক্যালেন্ডারের এক কোষে আটকে রাখা যায় না। সে আসে ধীরে, ছড়িয়ে পড়ে, চলে যায়—কারুর অনুমতি না নিয়েই। এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারই তাকে রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক করে তোলে। বসন্ত মানে কেবল প্রেম নয়; বসন্ত মানে জাগরণ। বসন্ত মানে শরীরের, প্রকৃতির এবং চেতনার পুনরুদ্ধার।
এই উপমহাদেশে তাই প্রেম সবসময় প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত। বর্ষার কালো মেঘ শ্যামের চোখ হয়ে ওঠে, শ্রাবণের জল প্রিয়ার চোখের জল। এখানে অনুভব আর প্রকৃতি আলাদা নয়—এই অভিন্নতাই ক্ষমতার পক্ষে অস্বস্তিকর। কারণ যেখানে জীবন নিজেই অর্থ তৈরি করে, সেখানে রাষ্ট্র বা বাজারের ভাষ্য চাপানো কঠিন।
এইখানেই রাজনৈতিক ইশারাটা স্পষ্ট হয়। প্রকৃতি, জীবন, প্রেম, বিরহ—এরা কেউই এককভাবে শাসনযোগ্য নয়। এরা সমান্তরালে চলে। একসময় মিশে যায়। এই অদ্বৈত অভিজ্ঞতা ফ্র্যাগমেন্টেশনের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। যখন রাষ্ট্র চায় নাগরিককে ভাঙতে—ভোটার, ভোক্তা, পরিচয়, সংখ্যায়—তখন এই সামগ্রিক জীবনবোধ নিজেই এক ধরনের প্রতিরোধ হয়ে ওঠে।
বসন্তকে প্রেমের ঋতু হিসেবে গ্রহণ করেও আমরা জানি—‘বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা?’ বসন্তের মধ্যেই আছে ক্ষয়, দ্বন্দ্ব, বিদায়। এই স্বীকৃতিই রাজনৈতিক। কারণ ক্ষমতা সবসময় একটি চকচকে, নির্বিবাদী বাস্তব দেখাতে চায়। কিন্তু জীবন কখনও একরৈখিক নয়। পূর্ণতা মানে নিখুঁততা নয়—পূর্ণতা মানে সমস্ত বিরোধকে ধারণ করা।
এই উপমহাদেশে কোনও তত্ত্বই কেবল বইয়ে আটকে থাকে না। তত্ত্ব এখানে অনুশীলন। সেই কারণেই ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞানচর্চায় ‘অনুশীলন’ কোনও গৌণ শব্দ নয়—তা মূল ভিত্তি। জানা মানে করা। বোঝা মানে বদলানো। এই কারণেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লবী গুপ্ত সংগঠনের নাম হয় ‘অনুশীলন সমিতি’। নামের মধ্যেই ছিল দর্শন—চিন্তা তখনই রাজনৈতিক, যখন তা জীবনে নেমে আসে।
আজকের সময়ে, যখন অনুভবও পণ্যে পরিণত, প্রতিবাদও ইভেন্ট হয়ে ওঠে, তখন বসন্ত কোনও রোমান্টিক রূপক নয়—সে এক রাজনৈতিক অবস্থান। বসন্ত মানে এমন এক জীবনবোধ, যা চিহ্নের শাসন মানে না। যে জীবন নিজেই কথা বলে, নিজেই চলে, নিজেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এই বসন্তই সেনা। নীরব, বিস্তৃত, অপ্রতিরোধ্য। কোনও পতাকা নেই। কোনও দিবস নেই। কিন্তু আছে অগণন শরীর, অগণন ঋতু, অগণন অনুশীলন। আর সেখানেই তার রাজনৈতিক শক্তি।
Leave a Reply