মাঝে মাঝে মনে হয়, উপন্যাস লিখে আমি যেন নিজের জন্য অপ্রয়োজনীয় এক স্থাপত্য নির্মাণ করছি। চরিত্রের জন্য আলাদা ঘর, প্লটের জন্য সিঁড়ি, ক্লাইম্যাক্সের জন্য জানালা। সব কিছু মেপে দিতে হয়। যেন আমি একজন স্থপতি, অথচ ভিতরে ভিতরে আমি আসলে এক ভ্রমণকারী—যার কাছে মানচিত্র নেই, আছে শুধু হাঁটার তাগিদ।

এই সময়েই মনে পড়ে অ্যানাই নিন (Anaïs Nin)-এর কথা। তিনি যেন জীবনের ভেতরেই বসে লিখেছেন, জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়। তাঁর ডায়েরি কোনও নির্মাণ নয়, বরং এক অন্তহীন প্রবাহ—যেখানে প্রতিদিনের অনুভূতি, স্বপ্ন, যৌনতা, ভয়, অপরাধবোধ, আত্মপ্রেম—সব কিছু একই পৃষ্ঠায় এসে বসেছে। সেখানে গল্পের শৃঙ্খলা নেই, আছে আত্মের স্পন্দন।

উপন্যাস লিখতে গেলে আমাকে ‘অন্য’ হতে হয়। চরিত্রের ভেতরে ঢুকতে হয়, তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়। সেখানে আমি এক ধরনের ঈশ্বর—আমি জানি কে কখন জন্মাবে, কে কখন মরবে, কোন সংলাপ কোথায় বসবে। অথচ ডায়েরিতে আমি ঈশ্বর নই, আমি স্রেফ উপস্থিত। আমি জানি না আগামীকাল কী লিখব। জানি না আজকের অনুভূতির কোনও পরিণতি আছে কি না। এই অজানাই ডায়েরির স্বাধীনতা।

ডায়েরি আমাকে এমন এক সত্যের কাছে নিয়ে যায়, যা আমি নিজেই জানি না। উপন্যাসে আমি সত্য নির্মাণ করি; ডায়েরিতে আমি সত্যের সামনে দাঁড়াই। কখনও দেখি, আমি নিজের সম্পর্কে সবচেয়ে কম জানি। নিজের রাগ, নিজের কামনা, নিজের ভয়—এসবই আমার কাছে অচেনা ভূখণ্ড। ডায়েরি সেই অচেনাকে ভাষা দেয়। ভাষা দিয়ে তাকে চিনিয়ে দেয়, আবার ভেঙেও দেয়।

ডায়েরির কোনও প্লট নেই—কিন্তু জীবন কি আদৌ প্লট মেনে চলে? আমরা কি প্রতিদিন কোনও সুসংগঠিত আখ্যানের অংশ? নাকি আমরা খণ্ডিত, অসংলগ্ন, পরস্পরবিরোধী? ডায়েরি এই খণ্ডিততাকে স্বীকার করে। সেখানে আজকের আমি আর গতকালের আমি এক নই। কোনও সম্পাদক এসে তাদের মিলিয়ে দেয় না।

কখনও মনে হয়, উপন্যাসের ভেতরে আমি নিজেকে আড়াল করি। চরিত্রের মুখোশ পরে কথা বলি। ডায়েরিতে মুখোশ খুলে ফেলতে হয়। অথবা, আরও ভয়ের কথা—সেখানে হয়তো আমি আবিষ্কার করি, আমার কোনও নির্দিষ্ট মুখই নেই। আমি শুধু চলমান এক উচ্চারণ।

ডায়েরি তাই আমার কাছে কেবল ব্যক্তিগত নথি নয়; এটি এক অস্তিত্বগত অনুশীলন। এখানে আমি প্রতিদিন নিজের সঙ্গে দেখা করি। কখনও ভালোবাসি, কখনও ঘৃণা করি, কখনও সন্দেহ করি। কিন্তু আখ্যানের বাধ্যবাধকতা আমাকে তাড়া করে না। কেউ জানতে চাইবে না, ‘শেষে কী হল?’ কারণ এখানে শেষ বলে কিছু নেই। আছে কেবল লেখা—এবং লেখা চলার সম্ভাবনা।

হয়তো সত্যিই, সারাজীবন যদি শুধু ডায়েরিই লিখতাম, তবে আমি আরও সৎ হতাম। অথবা আরও ভাঙাচোরা। কিন্তু হয়তো সেই ভাঙনই আমার সবচেয়ে বড় আখ্যান—যার কোনও কভার নেই, কোনও সমালোচনা নেই, শুধু আছে এক ব্যক্তিগত মহাবিশ্বের ক্রমাগত বিস্তার।