আমার গল্পের চরিত্রেরা, আবহেরা, চিরকাল আমার কাছে এমন এক দুর্গম অন্ধকারমালা বিছিয়ে রেখেছে, রেখে বলছে, ‘‘বাইরে দাঁড়াও। ভেতরে তোমার প্রবেশ অধিকার নেই।’’ আমি চেষ্টা করি গল্পগুলোর কোনও চরিত্রকে ঘুষ দিয়ে পটিয়ে-পাটিয়ে ভেতরে ঢোকার ছাড়পত্রটা যদি জোগাড় করতে পারি। হচ্ছে না। এ হবে না। আমি এখানে অ্যাবসোলিউটলি স্ট্রেঞ্জার। ফলে আমার কোনও চরিত্রকে নিয়েই তাদের মতো করে নিটোল পরিপাটি গল্প লেখা আমার হয়ে ওঠেনি। চিরকাল আমি যেটা করেছি, গল্পের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চরিত্রদের ভাসা ভাসা গলার মৃদু আওয়াজ পেয়ে লিখেছি। আড়ি পাতা। আমার অযোগ্যতাই আমার সব গল্পের বিষয়। দক্ষতা নয়, আমার অদক্ষতাই আমার গল্পের চালক। আমার জানা নয়, আমার অজানাই আমার রহস্য। রাতের তারার আলোয় আমি যে গল্প ও তাদের চরিত্রদের সামান্য অবয়বটুকু দেখেছি, সেটাই বলি না-হয়। লেখক হয়েছি বলে খামোকা তারার আলোয় দেখা চরিত্রকে দিনের শাদা আলোয় দেখার ভান কেন করব!

উপন্যাসে, গল্পে, আমি সবসময় লিখতে চেয়েছি, আমার বাস্তবতা, যেটা সম্পর্কে আমি সবচেয়ে কম জানি অথবা কিছুই জানি না। আমার নিজের এবং আমার বাস্তবতার ভেতরে খোঁদল করতে করতে আমাকে ঢুকতেই হত এই গহ্বরে, যেটা অনেকটা একটা আদিম গুহা বা সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ার মতোই, যেখানে ঢোকার পর কী হবে তা আমি কখনওই আগে থেকে জানি না, এর কোনও পূর্বানুমান নেই। হ্যাঁ, বিষয়টা একই সঙ্গে উত্তেজনার এবং একই সঙ্গে বিষণ্ণতার, চমকপ্রদ এবং একঘেয়ে, একইসঙ্গে। আমি জানি না এই জগৎ কী করে আমার কাছে আসছে, বা এসবের মধ্যে দিয়ে সে আসলে কী বলতে চাইছে। ব্যাপারটা কবিতা লেখার মতোই অনেকখানি, যখন কবি জানেন না পরের লাইনে তিনি কী লিখবেন। আমার বরাবরের যেটা স্বভাব, ক্ষেত্র নয়, আত্মসমীক্ষা। বাংলা সাহিত্যের পারিবারিক সদস্যদের ধারা মেনে অনেক বন-জঙ্গল-নদী-পর্বত-গ্রাম-আদিম জনজাতিদের মধ্যে ঘুরে অথবা নস্টালজিয়া খোঁড়াখুঁড়ি করে বিস্তর গবেষণা সন্দর্ভের মতো ‘আমিন সাহিত্য’ উৎপাদন, এসব বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, আমার নয়। এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। আমাকে সমীক্ষা চালাতে হয় নিজের ভেতরে। খোঁড়াখুঁড়ি যা কিছু নিজের বাস্তবতার জঙ্গলে। আটটি উপন্যাস এভাবেই। সত্তরটি গল্প অন্ততঃ, এ পথেই। আখ্যানটি বলার জন্য আমার কোনও রীতি নেই৷ প্রত্যেকটির জন্য প্রয়োজনীয় গদ্যশৈলী খুঁজতে আমাকে বসে থাকতে হয়, হাতড়াতে হয়, অন্ধকারে। এছাড়া কোনও উপায় আমার জানা নেই। পুরোটা লেখার সময়কালে, লেখাটার সঙ্গে আমার এত ধ্বস্তাধস্তি চলে যে, আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত, নিঃশেষিত হয়ে যাই পুরো। সম্পূর্ণ ছিবড়ে। তারপর আবার নিজেকে তুলে আরেকটা আখ্যানের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং ফের একইরকম ধ্বস্তাধস্তি, শরীর-মন-মাথার ভেতর দিয়ে অসম্ভব ঝড়, বয়ে যায়। এই যুদ্ধটা প্রচণ্ড অবসাদগ্রস্ত করে তোলে নিজেকে। সংশয়ে কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত অবস্থা। তখন মনে হয়, সত্যিই মনে হয়, আর নয়। আমার তো নিজেকে, নিজের মনকে ভালো রাখারও দায়িত্ব রয়েছে। লিখছি কেন তবে? লিখনে কী ঘটে?