দার্শনিক প্রস্থান
মার্ক্সের মৃত্যু—এই কথাটা উচ্চারণ করার মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা আছে। যেন আমরা কোনও মানুষকে নয়, বরং একটি সময়কে সমাহিত করছি। একটি ভাষা, একটি স্বপ্ন, একটি ব্যাখ্যার পদ্ধতি—যা একসময় পৃথিবীকে বোঝার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় বলে মনে হয়েছিল।

কিন্তু ইতিহাসের একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। সে কখনও কোনও চিন্তাকে একেবারে হত্যা করে না। সে তাকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে তোলে।
সম্ভবত মার্ক্সের মৃত্যু সেই ক্লান্তিরই অন্য নাম।
যে পৃথিবীর কথা তিনি কল্পনা করেছিলেন, সেই পৃথিবী এখনও এসে পৌঁছায়নি। আবার যে পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, সেটাকেও তাঁর ভাষায় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। এই অদ্ভুত ফাঁকেই মার্ক্সের প্রকৃত পরিণতি লুকিয়ে আছে—না সম্পূর্ণ উপস্থিত, না সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
মাঝে মাঝে মনে হয়, চিন্তারও এক ধরনের জৈব জীবন আছে। তারা জন্মায়, বিস্তার লাভ করে, তারপর ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব ওজনেই ভারী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তারা ইতিহাসের ভিতরে বসে থাকে—একটি পুরোনো বৃক্ষের মতো—যার ছায়া এখনও পড়ে, কিন্তু যার বীজ আর তেমনভাবে ছড়ায় না।
তবুও মৃত্যু শব্দটা এখানে পুরোপুরি সত্য নয়।
কারণ যতদিন অসমতা থাকবে, যতদিন মানুষের শ্রম অদৃশ্য হয়ে থাকবে, যতদিন ইতিহাসের ভেতরে কিছু মানুষ বারবার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে—ততদিন কোনও না কোনওভাবে সেই পুরোনো প্রশ্নগুলো ফিরে আসবে।
সম্ভবত মার্ক্স তখন আর একটি নাম থাকবেন না। তিনি হয়ে উঠবেন কেবল একটি অস্বস্তি। একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। একটি অসমাপ্ত বাক্য।
আর সেই কারণেই হয়তো তাঁর মৃত্যু কখনও সম্পূর্ণ হয় না।
ইতিহাস মাঝে মাঝে কাউকে সমাধিস্থ করে না—শুধু তাকে নীরব করে রাখে।
Leave a Reply