সাম্প্রতিকতম উপন্যাস যা পড়ে ভালো লাগছে সেগুলো নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করছিলাম। এর আগে একটি উপন্যাস নিয়ে লিখেছিলাম। দ্বিতীয় উপন্যাস অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভারতীয় নোটবুক’। এই উপন্যাসের আলোচনা করতে হবে খুব সাবধানে। কারণ এর গল্পাংশ তিন-চার বাক্যে বলে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেটুকু নেহাতই বাইরের আবরণ। আসলে এই গল্পের স্রোতে সুদূর অতীত থেকে এক চলমান সময়কে ধরা হয়েছে। এক মৃত লেখক যে কেবল প্রীতিমূলক উপাদেয় লেখা লিখে যেতে চায়, যে স্মৃতিশূন্য, তার লিভিং ডেড ম্যান হয়ে, কেন্নোর মতো গুটিয়ে না গিয়ে, প্রকৃত অর্থে বেঁচে ওঠার কথা বলে এই উপন্যাস। এই উপন্যাসে চরিত্র সংখ্যা হাতে গোনা।
কিন্তু এই সামান্য কয়টি চরিত্রের সঙ্গে কথোপকথনে নানা বিবৃতি (যা প্রায় দার্শনিক প্রস্থানের মতো) উঠে এসেছে। কথার মারপ্যাঁচেই এই লেখক ব্যক্তিটি নিজের অপারগতাকে তত্ত্বায়িত করতে চেয়েছে। অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য নির্মাণ শিল্পীই হোক অথবা গেরিলা যুদ্ধের সৈনিক অথবা তার স্ত্রী, অথবা তার সাক্ষাৎকার নিতে আসা লেখকের মাতৃভূমির কোনো যুবক, লেখক ব্যক্তিটির বাস্তব থেকে পলায়নপরতা প্রতিক্ষেত্রেই ফুটে উঠেছে। তার নিরাপদ অবস্থানকে সে নানাভাবে গ্লোরিফাই করতে চেয়েছে। কিন্তু একটা সময় সে আবিষ্কার করে সে আসলে মেরুদণ্ডহীন লোটে মাছের মতো। যে মাছগুলোকে হাতে নিয়ে তার মনে হয় এগুলো একদলা কফ। শেষপর্যন্ত অতিবাস্তবতাই বলি বা রূপক, সে মৃত-জীবিত ব্যক্তি হয়ে ওঠে। তার স্মৃতি ফিরে আসে। সে এবার গেরিলা যুদ্ধের সৈনিকদের মতোই মানুষের জন্য কাজ করতে শুরু করে। এক দেশ, এক জাতি, এক পতাকা, এক মাপের মানুষ গড়ার কারিগরদের বিরুদ্ধে তার এক অনন্য লড়াই। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই উপন্যাসের সব চরিত্রগুলোই আসলে একই ব্যক্তির বিভিন্ন সত্তা। প্রতি মুহূর্তে একটিই চরিত্র তার বিভিন্ন সত্তার সঙ্গে কথা বলে গেছে। তার প্রাজ্ঞ সচেতন বোধ উপন্যাসের পরতে পরতে চমক সৃষ্টি করেছে। এই উপন্যাস টানা পড়ে শেষ করে ফেলার নয়। প্রতি মুহূর্তে এই উপন্যাস ভাবনার উপাদান সঞ্চয় করতে করতে চলেছে। এবং একবার পড়েই এর সব অতিবাস্তবতাকে ডিকোড করা সম্ভব নয়। বোঝা যায় এক গভীর চিন্তাস্রোত থেকে এই উপন্যাসের জন্ম। নিছক গল্প বলিয়ে নন অর্জুন। নিছক জটিল তত্ত্ববাহকও নন। তারপরও তাঁর নিজের কথা বলার অন্য কৌশল আছে। এই উপন্যাস তাই বারবার পঠিত হওয়ার দাবি রাখে।বইটি সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত।
এই সময়ে যাঁরা লিখছেন তাঁদের মধ্যে আপনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। আপনার লেখার মধ্যে দিয়ে আপনি যে দর্শনের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠককে তা আসলে অতুলনীয়। এই অস্থির সময়ে আপনার লেখা না পড়লে আসলে অনেকটাই না বোঝা থেকে যায় বাংলা সাহিত্যের। আমি বুকে হাত রেখেই বলছি অর্জুন, আপনার সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম পুরস্কারটি পাওয়ার কথা। জানিনা আপনার লেখা অনুবাদ হয়ে সেই অবধি পৌঁছোতে পারবে কি না… কিন্তু আমি এবং আমার বৃত্তের বেশ কিছু মানুষ আপনার লেখাকে কেবল গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তাই নয়, আপনার লেখাকে আঁকড়ে বাঁচেন।
আপনি ভালো থাকুন অর্জুন। আপনার এই দুঃখিনী হতভাগ্য বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দেওয়ার আছে।
Leave a Reply