একটা উৎকৃষ্ট গদ্য লিখনকালীন যে তৃপ্তি—তার তুলনা খুঁজতে গিয়ে মানুষ শরীরের দিকে তাকায়। আমি তাকাই ভাষার দিকে। শরীরের চূড়ান্ত মুহূর্তে যে বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে, তা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু বাক্যের ভিতর যে আগুন ধীরে ধীরে পাকে, তা দীর্ঘস্থায়ী, তা পুনর্গঠিত হয়, তা ফিরে আসে স্মৃতির ভেতর, পুনরায় পাঠে, পুনরায় উচ্চারণে।

যৌনসুখ একটি বিস্ফোরণ। লেখা একটি নির্মাণ। বিস্ফোরণ শেষে দেহ ক্লান্ত হয়; নির্মাণ শেষে মন স্থির হয়। দেহের তৃপ্তি এক প্রকার অবসান—লেখার তৃপ্তি এক প্রকার সূচনা। একটি গদ্য যখন নিজের ছন্দে দাঁড়িয়ে যায়, যখন একটি বাক্য আরেকটি বাক্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয় যেন তাদের আলাদা করা যায় না, তখন মনে হয় আমি কেবল লিখিনি—আমি এক প্রকার অস্তিত্ব নির্মাণ করেছি।

শরীরের সুখে আমি নিজেকে হারাই। লেখার প্রক্রিয়ায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই।
সেখানে উত্তেজনা আছে, কিন্তু তা অন্ধ নয়; সেখানে আবেগ আছে, কিন্তু তা বিশৃঙ্খল নয়। শব্দ বাছাইয়ের যে সূক্ষ্মতা, একটি অনুচ্ছেদের ভেতর শ্বাসের মতো বিরতি বসানোর যে শ্রম, একটি রূপককে শেষ পর্যন্ত বহন করার যে ধৈর্য—এসব মিলিয়ে যে তৃপ্তি জন্মায়, তা কেবল অনুভূতি নয়, তা চেতনার পরিপূর্ণতা।

একটি গদ্য ধীরে ধীরে নিজের আকৃতি নেয়। প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর ছায়াময়, তারপর ধ্বনিময়। এই রূপান্তরের প্রত্যক্ষদর্শী আমি নিজেই। যেন আমার ভেতরে একটি অদৃশ্য কর্মশালা—যেখানে কাঁচামাল হলো অভিজ্ঞতা, হাতিয়ার হলো ভাষা, আর স্থপতি ও শ্রমিক একই মানুষ। সেই কর্মশালায় যখন একটি বাক্য ঠিকঠাক বসে যায়, যখন একটি শব্দ অপ্রত্যাশিত অথচ অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখন যে কম্পন অনুভূত হয়—তা নিছক সুখ নয়, তা স্বীকৃতি।

লেখার আনন্দে কাম আছে, কিন্তু তা শারীরিক নয়—তা সৃষ্টির কাম।
এ এক ধরনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা, যা পূর্ণ হলেও শেষ হয় না। বরং পূর্ণতাই তাকে নতুন অসম্পূর্ণতার দিকে ঠেলে দেয়। একটি লেখা শেষ হলেই আরেকটি লেখার অভাব জন্মায়। এই অভাবই আমার প্রকৃত তৃষ্ণা।

শরীরের সুখের জন্য অন্য একজন প্রয়োজন।
লেখার তৃপ্তির জন্য প্রয়োজন গভীর একাকিত্ব।
একা বসে থাকা, শব্দের সঙ্গে লড়াই করা, নিজের অক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া—এ সবের শেষে যে স্বচ্ছতা আসে, তা কোনও স্পর্শের বিকল্প নয়। বরং তা স্পর্শেরও অতিরিক্ত। কারণ সেখানে আমি কেবল অনুভব করি না—আমি বুঝি।

আমি যখন লিখি, তখন আমি নিজের ভিতরকার অন্ধকারে নামি। সেখানে ভয় আছে, লজ্জা আছে, অপরাধবোধ আছে, অস্বীকার আছে। সেই অন্ধকার থেকে একটি বাক্য তুলে আনতে পারা—এ এক ধরনের মুক্তি। এই মুক্তিই আমাকে তৃপ্ত করে। এটি দেহের প্রশান্তি নয়; এটি আত্মার প্রসারণ।

একটা উৎকৃষ্ট গদ্য লিখনকালীন যে তৃপ্তি, তা তুলনার অতীত।
এ শুধু সুখ নয়; এ এক ধরনের অস্তিত্বের স্বাক্ষর।
লেখা শেষ হলে আমি নিঃশেষ হই না—বরং আরও স্পষ্ট হয়ে উঠি।

৩ মার্চ, ২০২৬
কলকাতা শহর