১) লেখালেখির ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় সবাই কবিতা দিয়ে শুরু করে। আপনার শুরুও কি কবিতা দিয়ে? বা আপনি কিভাবে গল্পে এলেন?
যে জিনিস অনতিব্যক্ত অবস্থা থেকে ক্রমশঃ ব্যক্ত হয়েছে, তার আরম্ভসীমা নির্দেশ করা কঠিন। গল্পে কীভাবে এলাম, এটা বলার আগে বলতে হয়, গল্পেই তো ছিলাম। একেকটা কবিতা, অথবা ছবির মধ্যেও কি গল্প ঢুকে থাকে না? আড়ালে? গল্প যে-কোনও জায়গা থেকে শুরু হয়ে যেতে পারে। যে-কোনও অবস্থায়। যেমন কবিতাও যে-কোনও জায়গা থেকে শুরু হয়ে যায়। তুমি কি বিশ্বাস করো কপালকুণ্ডলা অথবা আরণ্যকের গদ্যে কবিতা এবং কবিত্ব নেই? কীভাবে একটা গল্পের ভেতরে আমরা ঢুকে পড়ি, এবং একসময় সেটা লেখা শুরু হয়, এটা অনতিব্যক্ত অবস্থা থেকে ক্রমশঃ ব্যক্ত হওয়ার একটা প্রক্রিয়া।
তবুও যদি লেখার আকৃতিগত বা গঠনগত দিক বিবেচনা করে এই প্রশ্ন করো, তবে বলব, না, কবিতা দিয়ে শুরু নয়। গল্প দিয়েও নয়। অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমি একটা নাটক লিখতে শুরু করেছিলাম, কৈশোরে যেমন স্বপ্ন থাকে, দিনগুলো কত সহজেই রঙিন হয়, তখন সেভেন কিম্বা এইটে পড়ি। যদিও সে নাটক আমি সম্পূর্ণ লিখে উঠতে পারিনি। পারার কথাও নয়। তবে এটাই ছিল আমার প্রথম সাহিত্য-প্রচেষ্টা। গল্প, উপন্যাস তথা আখ্যানে আমাকে আসতেই হত, কারণ এর বীজ আমার মধ্যে বপন করে দিয়েছিলেন আমার বাবা। ছেলেবেলায়, রোজ দুপুরে তিনি আমাকে আশ্চর্য সব গল্প বলে ঘুম পাড়াতেন। সেইসব গল্প তিনি ওই মুহূর্তে মুখে মুখেই তৈরি করতেন। সেসব গল্পের মধ্যে ঘটনা, কাহিনি, প্লট— বিশেষ কিছুই নেই। অথচ গল্পগুলো সপ্তাহজুড়ে ধারাবাহিকভাবে চলেতে থাকত, এমনই তার আকর্ষণীয় চুম্বক-টান। গল্পগুলো শুনতে যত সহজ ছিল, বলাটা তত সহজ ছিল না, কারণ ওই গল্পগুলোর মধ্যে আসল জিনিস যেটা ছিল, সেটা হল, বলার স্টাইল। এরপর পনের-ষোল বছর বয়স থেকে আমি কবিতা লিখতে শুরু করি। প্রথম বই, উনিশ বছর বয়সে, কবিতার বই। প্রায় বারো-চোদ্দ বছর টানা কবিতা লিখে যাওয়াটা আমাকে আখ্যান লিখতে বিপুল সাহায্য করেছে, এখনও করছে। কারণ কবিতা হল সেই শিল্প যেখানে কম কথায় সবচে’ বেশি কিছু বলতে হয়; যেখানে ইঙ্গিত, ইশারা এবং অবশ্যই ভাষা প্রাধান্য পায় সবচে’ বেশি। এমনকি যতিচিহ্নও। এবং যে-কোনও শিল্পেরই অন্তিম গন্তব্য, কবিতা হয়ে ওঠা। তাই উপন্যাস কিংবা গল্প লেখার সময় আমি ভাবি এটা যেন কবিতা হয়ে ওঠে। কিছু কিছু হয়। বেশিরভাগই হয় না।
২) গল্প লিখতে এসে আপনি কার কার কাছ থেকে প্রেরণা পেলেন? বা আপনি কি আদৌ এই ‘প্রেরণা’ কথাটায় বিশ্বাস করেন?
প্রেরণা কী জিনিস আমার জানা নেই। এর বদলে আমি একটা কথা বলি ইনিশিয়াল ইম্পেটাস, এটা যে কোথা থেকে কখন কীভাবে আসবে, তার কোনও পূর্বানুমান নেই। হয় না।
একজন লেখককে প্রেরণা দিতে পারে একটি শাদা পাতা। কারণ তাঁকে যা লিখতে হবে তা যেন এই শাদা পাতার চেয়ে উৎকৃষ্ট হয়। কীভাবে এই শাদা পাতা উলটে তিনি পরের পাতায় যাবেন? কোনও প্রেরণা তাঁর জন্যে নেই। আছে ইম্পেটাস। তাই শাদা পাতা তোমাকে কীভাবে প্রোভোক করছে, ট্রিগার করছে সেটা লক্ষ করো। লক্ষ করো মাঝেমাঝে এর কাছে কত অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে। কত ক্ষুদ্র। কীভাবে পেরিয়ে যাবে একটা শাদা পাতা, লিখেই পেরুতে হবে, না লিখে তো পরের পাতায় যেতে পারবে না। এটা অনেকটা শাদা পাতার বৈধব্য ঘোচানোর দায়। জাপানের এই সময়ের এক কবি, মারি কাশিওয়াগি অবশ্য বলেন, টেরর অব হোয়াইট পেজ-এর কথা। শাদা পাতার সন্ত্রাস। শাদা পাতা, লেখকের সম্বল ওটুকুই। জেলখানায় ছোট্ট কুঠুরিতে একটা নোটবইতে পেন্সিল দিয়ে খুদে খুদে অক্ষরে নিবিষ্ট মনে লিখে যাচ্ছেন আন্তোনিও গ্রামসি। শাদা কাগজ না পেয়ে জেলখানার শাদা দেওয়ালকেই কাগজ বানিয়ে নিয়েছিলেন নজরুল, আর জেলের রান্নাঘরের পোড়া কাঠ কয়লার টুকরোকে করেছিলেন কলম। আবার খুব দ্রুত লেখা হচ্ছিল বলে বিদ্রোহী কবিতাটা নজরুল কলমে নয়, লিখলেন পেনসিলে। মারকেস আবার শাদা কাগজে টাইপ করছেন তিন পাতা, পাশের ওয়েস্ট পেপার বক্সে ফেলে দিচ্ছেন বাতিল তিরিশ পাতা। তুমি মহাকাশে লিখছ, লিখে, মহাকাশে ফেলে দিচ্ছ; মহাকাশ তোমার দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে আরেক পাতা মহাকাশ।
পাতা ওলটাতে ওলটাতে বারবার আমি ঘুরেফিরে ওই শাদা পাতাগুলোয় থামি। শাদা পাতা আমাদের বিনম্র হতে বলে। দায়িত্বের কথা মনে করায়। প্রতিটি শাদা পাতা আমাদের বলে, দেয়ার ইজ আ পেন। লিখো। আমার উপর লিখো। আমার শূন্যতাকে হয় ভাঙো। নয়তো ধারণ করো একে। চুপ করে। নীরবতার সন্তান, নীরবতায় এসে থামো। সম্ভাবনার কথাও বলে শাদা পাতা। ত্রস্তও করে। লেখা শেষ হওয়ার পর যে লেখা শুরু হয় সেই লেখার অনুরণন হয়ে, তাকে ধরার জন্যই পাতারা শাদা থাকে। শাদা পাতারা থাকে। শাদা পাতারাই থাকে প্রভোক করার জন্য। সিডিউস করার জন্যও। সবচেয়ে যেটা বড়ো কথা, শাদা পাতার কোনও সময় সারণি থাকে না। সময়ের ভেতর সে একটা অসময়। মনে হয়, যেকোনও খাতার সবচেয়ে সুন্দর অংশ, সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বাক্য ও প্যারাগ্রাফগুলো তার শাদা পাতাগুলোতেই আছে।
এই ইম্পেটাস অন্যভাবেও আসতে পারে। যেমন ধরা যাক, ২০২২-এ অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ শুরু হয়েছিল ‘ভারতীয় নোটবুক’ লেখার কাজ। কাগজে কলমে এর খসড়ার কাজ শুরু আরও আরও অনেক আগে। কিন্তু আমি এটা লিখে উঠতে পারছিলাম না। প্রথমতঃ, ভেতরে আরও কিছু ছোট-বড় আখ্যানের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল এবং সেগুলো আমাকে এবং ওই লেখাগুলোকে, দুজনকেই ফেলেছিল বেশ টানাপোড়েনের মধ্যে। এর ফলে আমাকে ‘ভারতীয় নোটবুক’ উপন্যাসের অনেক আগেই একে একে লিখে ফেলতে হয় ‘ব্রেনফিভার’, ‘পৃথা কখন আসবে’, ‘সেক্স অ্যান্ড ফিলোসফি’, এবং ‘এখানে আমি কী করছি’ এই সমস্ত উপন্যাসগুলো। নইলে মাথাটাকে ফাঁকা করা যাচ্ছিল না, যে-ফাঁকা মাথাটাকে আমি বলিপ্রদত্ত করব এই উপন্যাসের যূপদণ্ডে। আমার মনে হয়েছিল এই কাজটা করতে আমার অনেকটা সময় লেগেছে এবং আরও অনেকটা সময় আমার লাগবে। আমার মনে হয়েছিল এই উপন্যাসের জন্য আমাকে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে দাঁড়াতে হবে এর সামনে, যাতে সে আমার কৌমার্য গ্রহণে সম্মত হয়। এবং যার যূপে এই ফাঁকা মাথা পেতে অনুতাপহীনভাবে আমি বলতে পারব, ‘নাও। এইবার কাটো। হালাল কিংবা ঝটকা।’ ফলে আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল যথেষ্ট শূন্য হওয়ার মতো যথার্থ সময়ের।
কিন্তু যখন ২০২২-এর এপ্রিল থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ, এই সময়ে প্রথম চারটি উপন্যাসের কাজ শেষ করে আনা গেল, দেখলাম, আমার মাথাটাকে আমি যথেষ্ট ফাঁকা করতে পারলেও এখনও নিজের জন্য আনতে পারিনি সেই বস্তু, যাকে বলা হয় ইম্পেটাস, যা এই উপন্যাস রচনার জন্য আমার মধ্যে একটা অভিঘাত তৈরি করতে পারে চালিকা শক্তি উৎপাদনের জন্য। এই ইনিশিয়াল ইম্পেটাস, এটা তখনও আমার কাছে নেই। এটা এমন জিনিস, কোথা থেকে কখন কীভাবে আসবে পৃথিবীর কোনও লেখকই তা আগে থেকে বুঝতে পারে না। এখনও এমন কোনও যন্ত্র নেই যা একজন লেখককে বলে দিতে পারবে, এই রচনার জন্য ইনিশিয়াল ইম্পেটাস আমি কোথা থেকে কীভাবে পেতে পারি। এই পর্যায়ে আক্ষরিক অর্থেই ভিক্ষার ঝুলি হাতে নগরে পরিভ্রমণ ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই আরেক মাধুকরীব্রত। আমি তখন বসে আছি একটা অভিঘাতের অপেক্ষায়। যে-কোনও দিক থেকেই সে আসতে পারে এবং যে-কোনও সময়ে। আমাকে শুধু প্রস্তুত থাকতে হবে, যখনই সে আসবে আমি তাকে গ্রহণ করব ভুলহীনভাবে। আমাকে শুধু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে জমাট এই অন্ধকারের সামনে, যখনই অমোঘ সেই নির্দেশ আসবে, খুলে যাবে অন্ধকারের দরজা এবং আমি প্রবেশ করব তার গহ্বরে যেভাবে প্রবেশ করলে আমাকে গ্রাস করতে তার সুবিধে হবে সবচে’ বেশি। এরকমই এক সময়ে, আমি শুনলাম প্রধানমন্ত্রীর সেই দৈবাদেশ, ‘শুধু বন্দুকধারীদের নয়, কলমধারীদেরও নিকেশ করতে হবে।’ ব্যস, আমাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমার প্রস্তাবিত উপন্যাসের (ভারতীয় নোটবুক) জন্য ভরবেগ আমি পেয়ে গেলাম সেইদিন।
৩) আপনার প্রিয় গল্পকার কে বা কে কে এবং কেন?
এটা তো খাদ্যতালিকা নয়, যে, কারা প্রিয় বলে দিতে পারব। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন লেখক প্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে মোটামুটি ভাবে বলতে হলে, আমি কাফকা, পেটার বিকসেল, এতগার কেরেত, এবং অবশ্যই আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা বলব। আধুনিক পৃথিবীকে দেখা, একপ্রকার কাফকার চোখ দিয়েই আমরা দেখি। কেন এঁরা আমার পছন্দের তার কারণটা বলতে গেলে এতগার কেরেতের একটা গল্পের কথা বলি। গল্পটির নাম শ্বাসকষ্ট। মাত্র দশ-বারো লাইনের গল্প এটি। সেখানে কেরেত বলছেন, যাদের ফুসফুস ভালো, তারা যা মনে চায় বলুক, আবর্জনার মতো উগড়ে দিক সব কথা। কিন্তু যখন একজন শ্বাসকষ্টের রোগী বলে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি,’ তখন তা আলাদা ব্যাপার। যাঁদের নাম বললাম, এঁরা আমাকে শিখিয়েছেন পরিমিতি বোধ। কোথায় থামতে হবে, সেটা। রবীন্দ্রনাথও মৃত্যুর কিছু মাস আগে রানি চন্দকে বলেছিলেন, অনেক আগেই আমার থেমে যাওয়া উচিত ছিল, এত লেখা অসভ্যতা। এরপর ভারতচন্দ্র কোট করে বলেন, সে কহে বিস্তর মিছা, যে কহে বিস্তর।
৪) গল্প লেখার ক্ষেত্রে আপনি বেশি গুরুত্ব দেন বিষয় না ভঙ্গিমা? ফর্ম না কনটেন্ট?
এটা সাহিত্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্ন। একটা পর্যায়ে এগুলোকে পৃথক করা যায় না। একটা উম্বিলিক্যাল কর্ডের মতো এরা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যেমন আলাদা করা যায় না সময় এবং স্পেসকে, সেজন্যে একে একসঙ্গে বলা হয় স্পেসটাইম। এখন তো বিজ্ঞানীরা বলছেন স্পেস এবং টাইম বলেও কিছু হয় না। এগুলো আমাদের ইলিউশন।
যেটা হয়, লেখা নিয়ে নিজের তৈরি পরিকল্পনাগুলোকে লেখার মধ্যেই চুলোয় যেতে দেখাটা লেখক হিসেবে সবচে’ সুখকর অভিজ্ঞতা। কারণ কোনও লেখকই কি তাঁর লেখাকে সেইভাবে সাজিয়ে তুলতে পারেন, যেভাবে তিনি ভেবেছিলেন? তবুও তিনি লেখাটাকে নিজের মতো করে সাজানোর কথা ভাবেন; শেষ অবধি ব্যাপারটা যে তাঁর হাতে থাকবে না এবং যাবতীয় পরিকল্পনা চুলোয় যাবে, এটা জেনেও তিনি এই কাজ করেন। লেখার জন্যে পরিকল্পনা এবং লেখার মধ্যেই সেইসব পরিকল্পনাকে ভেস্তে যেতে দেখা ছাড়া একজন লেখক আর কীই-বা করতে পারেন।
৫) আর আপনি নিজে যখন পাঠক, তখন কী হিসাবে মূল্যায়ন করেন একটা লেখাকে, তার ফর্ম দেখে না কনটেন্ট দেখে?
তার ভাষা এবং যতিচিহ্ন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাক্য এবং যতিচিহ্নই গদ্য।
৬) একটা গল্পে সংলাপের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন? গল্প কি সংলাপ নির্ভর হওয়া উচিত? সংলাপে অনেক সময়ই দেখা যায় যে লেখকের নিজের কথাই একটু এদিক ওদিক করে চরিত্রের মুখ দিয়ে বের হচ্ছে। আপনার কি এরকম মনে হয়?
মারকেসের মতে, জীবনের সংলাপগুলো আমাদের বাস্তব জগতে যতটা সুন্দর লাগে, সাহিত্যে সেরকম লাগে না। আমার সেটা মনে হয় না। এখানে উচিত-অনুচিতের কোনও ব্যাপার নেই। গল্পটা কী দাবি করছে, সেটাই মূল ব্যাপার। যদি সে সংলাপ দাবি করে, তাহলে সংলাপ থাকবে। লেখার তো প্রাণ রয়েছে। তার দাবিই এখানে শেষ কথা। আর লেখকের নিজের কথা সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রের মুখ দিয়ে বেরোনো, এটা হতেই পারে। যদি চারজনের মধ্যে সংলাপ চলে, লেখক তখন নিজেকে চার টুকরো করে ওই চারটি চরিত্রের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। অথবা বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপগুলো আসলে লেখকেরই বিভিন্ন সত্তার মধ্যেকার সংলাপ হতে পারে। এর কোনও নিয়ম হয় না। নিয়মমাফিক কাজই যদি করতে হত তাহলে শিল্প-সাহিত্যের জগতে আসতাম না।
৭) গল্পকারের নিজস্ব ভাষা বা মৌলিক ভাষা কি থাকা উচিত বা আপনি বিষয়টাকে কিভাবে দেখেন?
ভাষা সবসময়েই দুরকম। বাস্তবের ভাষা এবং সত্যের ভাষা। ভাষা ছাড়া একজন লেখকের আছেটা কী? এটাই তার সংগঠন। তার অস্ত্রাগার। কোন ভাষাটা আমার হবে, সেটাকে আবিষ্কার বা/ও নির্মাণ সবচে’ জরুরি কাজ। কারণ সময় বড় এবড়োখেবড়ো। এখানে আমাদের জীবন ও স্বপ্নগুলো থেমে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে৷ মুখ থুবড়ে পড়ছে। আমার উপন্যাস, গল্প এসবের বাইরে ন্যাকা ও নিটোল ভাষার নিরাপদ বেষ্টনীতে গড়ে উঠতে পারে না। তাকেও হতে হবে আমার জীবন এবং সময়ের মতোই চূড়ান্ত ভালনারেবল। তাই আখ্যানের রৈখিক বাস্তবতা বারবার এলোমেলো হবে, তার নিরাপত্তা লুন্ঠিত হবে।
ভাষা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জগতের নিয়মতন্ত্রে একটা বুনিয়াদি ভূমিকা পালন করে। তাই উলটো দিক থেকে ভাষার স্ট্রাকচারকে যদি প্রশ্ন করা যায় তাহলে রিয়েলিটির গঠনকাঠামো জানার পথে আমরা অনেকটা এগোতে পারি। মুশকিল হল, ভাষা বলতে অনেকেই ভেবে বসেন, এই বুঝি ঝঙ্কার বা ঝমঝম করে কিছু বেজে ওঠার কথা বলা হচ্ছে। তা নয়। ভাষা বলতে বলা হচ্ছে, ভাষা নিয়ে সচেতনতার কথা। বলা হচ্ছে স্টাইলের কথাও। এক-একটা বিষয় বা প্লট যে এক-এক রকম ভাষা ও স্টাইল দাবি করে তা-ও অনেক শক্তিমান লেখক কেন যে ভুলে যান। পৃথিবীতে বা ব্রহ্মাণ্ডেই বলা ভালো, বিষয়ের অভাব নেই। বিষয় আবিষ্কার করতে হয় না। তা প্রকৃতির মতো। সর্বত্র আছে। বুধেও আছে। শুক্রেও আছে। স্টাইল এবং ভাষা আবিষ্কার করতে হয়, ভাস্করের মতো পাথর কুঁদে আবিষ্কার করতে হয়। কুমোরের মতো একতাল মাটি ছেনে রূপ দিতে হয়। এক-একটা মূর্তির এক-এক রূপ। এক-এক ভাষা। এক-এক আবেদন। বিষয় চিরকালই প্রচুর। স্টাইল এবং ভাষা অল্প। পৃথিবী যেমন একদিন জলের অভাবে মরে যাবে; মনে হয়, পৃথিবী একদিন ভাষার অভাবেও মরে যাবে। স্টাইলের অভাবেও।
৮) বাংলা ভাষা মানচিত্রে আপনি একটি উল্লেখযোগ্য জায়গায়। বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, শিলচর-সহ সমগ্র জায়গাতেই আপনাকে পাঠকেরা ভিন্ন ঘরাণার লেখক বলে সমীহ করেন। সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যের নিরিখে আপনার গল্পের মূল্যায়ন আপনার কাছে কি রকম?
অমিয়ভূষণের একটি গ্রন্থ আছে, যা ওঁর শেষ বয়সে আনন্দ থেকে প্রকাশিত হয়; এর চেয়ে যেটা জরুরি কথা, অমিয়ভূষণের একটি প্রশ্ন আছে, একজন ধূমপায়ী যেমন অন্ধকারে দাঁড়িয়েও পথের ওপর আলো না ফেলে অনেক সময় পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে ঝুলিয়ে লাইটারের আগুনটা জ্বালেন ফস করে নিজেরই মুখের সামনে; যেন অন্ধকার পথের চেয়ে এই মুখেরই প্রয়োজন বেশি আলোর। অমিয়ভূষণ সেইভাবে লিখতে লিখতে অনেকটা পথ এসে হঠাৎ ফস করে একটা প্রশ্নের আলো জ্বালেন নিজের সামনে; প্রশ্নটি এই, ‘লিখনে কী ঘটে?’ এটি উপরিউক্ত সেই গ্রন্থনামও বটে। তদুপরি এটি একটি প্রশ্ন এবং অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন, আমার মতে। লিখনে কী ঘটে?
আমি এখনও পুরোটা জানি না, লিখনে কী ঘটে। অর্ধেকও জানি না। কোনওদিন জানতে পারব, এরকম আত্মবিশ্বাস আমার নেই। শুধু জানি, একজন লেখক প্রতিটি বাক্য রচনার প্রারম্ভে প্রচণ্ড এক ভার অনুভব করতে পারেন, বুঝতে পারেন তাঁর সমস্ত বাক্যের শুরুতে এসে দাঁড়িয়েছে সময়ের মতো অনিবার্য এবং নাছোড় এক শমন, যাকে আর এড়ানো যাচ্ছে না, যদি তিনি দেখেন মানুষ তাঁর প্রতিটি বাক্যের নীচে পেনসিলের দাগ রেখে পড়ছে৷
সন্দীপন বলতেন, আমি ও আমার লেখা এক। এর চেয়ে মিথ্যে কথা দুটো হয় না৷ যদিও আমি এবং আমার লেখা, একই লাশের দু’ টুকরো, তবু আমার বাস্তবতা এবং আমার লেখার বাস্তবতা আলাদা। ঠিক যেভাবে আমি এবং আমার নিদ্রাকালীন স্বপ্নসমূহ এক নয়। আবার আমার লেখা এবং স্বপ্নসমূহ, দুইয়ের বাস্তবতাও আলাদা, কিন্তু দুটোরই শেকড় রয়েছে আমার জীবনে৷ আমার জীবন আমার লেখাকে তার শেকড় রাখার জন্য কিছু জায়গা দিয়েছে মাত্র৷ এটুকুই। ফলে, আমি এবং আমার লেখা, এক নয়৷ আমি আমার লেখার মতো দেখতে নই৷ আমি আমার মতোও দেখতে নই। সর্বোপরি, আমি বাইরের লোক। জীবনের বাইরে থেকে জীবনের ভেতরে এসেছি এবং একদিন জীবনের বাইরেই চলে যাব। থাকবে, যদি থাকার মতো হয়, তা, লেখা।
৯) গদ্যপদ্যের সীমারেখা ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। অনেকেই শুধু টেক্সট বলার পক্ষপাতী। এতে কি কোথাও গল্প বা আখ্যানকে ছোট করা হচ্ছে?
গদ্যপদ্যের শৈল্পিক সীমারেখা তখনও ছিল না যখন বঙ্কিমচন্দ্র কপালকুণ্ডলা লিখছিলেন। অষ্টাদশ শতকের মাঝের দিকে লেখা একটা চিঠি, যেটা লিখেছিলেন বৃদ্ধ এক সাধারণ মানুষ তাঁর ভাগ্নেকে; সেই চিঠির একটা পঙক্তি ছিল, ‘মোম বিসয়ে মনোযোগ তব নাস্তি’। বানানটা এরকমই ছিল। অমিয়ভূষণের মধু সাধু খাঁ-তে একজায়গায় আছে, ‘এমত দৃশ্য দেখিয়াছ আরু এমত প্রেম এমত খেলা’। যেকোনও শিল্পেরই অন্তিম গন্তব্য, কবিতা হয়ে ওঠা। আমাদের মহাভারত কীরকম লেখা?
১০) আপনার গল্পে কল্পনার একটি বড় ভূমিকা আছে। কখনো পরাবাস্তবতা বা কখনো জাদু বাস্তবতাও বলা যেতে পারে। আপনি নিজে বিষয়টাকে কিভাবে দেখেন?
অনেক সময় আমাদের বাস্তবজ্ঞান হল সত্যকে অত্যন্ত খারাপভাবে জানার ফল। আমার কাছে ইমাজিনেশন ইজ এভরিথিং। পাণ্ডিত্যপূর্ণ উদাহরণ কল্পনাশক্তির দৈন্যকেই প্রকট করে। দুঃখের হল, এই যে, এখন লেখকেরা শুধু তথ্য নিয়েই ব্যস্ত তা নয়, একইসঙ্গে ‘উচিত’ নিয়েও বড় ব্যস্ত, বরং সত্য নিয়ে নয়। মুদ্রাদোষের মতো তাঁরা কেবলই ভুলে যান, শিল্পের কাজ সত্যকে প্রকাশ করা, উচিতকে প্রকাশ করা নয়। যাহা উচিত, তাহা সত্য নাও হতে পারে। উচিত কথা বলার দায় রাজনীতিবিদের, সমাজকর্মীর, সমাজ সংস্কারকের। শিল্পী উচিত-অনুচিত দেখবেন না, তিনি সত্যের ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী। কিন্তু এখন লেখকদের কাজ হল, তথ্য এবং উচিত এই নিয়ে, তথ্যোচিত। অবশ্য তাৎক্ষণিক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী লেখকেরা এর বেশি আর কীই-বা করবেন। সত্যের জন্য তো কিছু নীরবতা প্রয়োজন। অন্তর্দীপ্ত নীরবতা। আপোলিনের প্রায় একশো বছর আগে লিখেছিলেন, আমরা অবিলম্বে নীরবতায় অভ্যস্থ হয়ে উঠব। সেটা আমরা হয়েও উঠেছি ইতোমধ্যে। তথ্যবহুল সত্যহীন নীরবতায়।
তবে একদিক থেকে আমাকে বলতেই পারেন কেউ নিয়তিবাদী, অদৃষ্টবাদী। কিন্তু এ সত্য, যে, আমি বিশ্বাস করি, উপন্যাস, কোনও আখ্যান, লেখা যায় না৷ উপন্যাস জন্মায়। গান জন্মায়। লেখা লেখে, আমি বসে থাকি৷ বিরসা কিম্বা সিধো, কানহু যখন তাঁদের জনজাতিকে সংঘবদ্ধ করছেন, তখনও তাঁরা নিজেদের কৃতিত্বকে স্বীকারই করছেন না, বরং বলছেন, মারাং বুরু আমাদের নেতা। তিনিই আমাদের পথ দেখাবেন। আমরা লড়ব তাঁর জন্য৷ প্রাণ দিলে, দেব তাঁর জন্যেই। দেখুন রামপ্রসাদকে, তিনি তো আদিবাসী জনজাতিকে নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন না, তিনিও বলছেন, সকলই তোমার ইচ্ছা৷ বাইবেল বলছেন, দাই উইল বি ডান। এটাই আমাদের আদিম সভ্যতা, যেখানে অহং-এর অস্তিত্বই নেই। এখানে তাই একজন কবি বলেন, আরও প্রেমে আরও প্রেমে, মোর আমি ডুবে যাক নেমে। মহাভারতের প্রক্ষিপ্ত অংশগুলো দেখুন, আমরা জানতেই পারি না, কারা সেসবের লেখক, রচয়িতা। পাকিস্তানের সংগীতশিল্পী ফরিদ আয়াজ এবং আবু মোহাম্মদকে বলতে শুনি, এখনও সেখানে কবীরের গান লেখা হয়ে চলছে। অথচ কবীর তো এখন আর নেই৷ তাহলে? ফরিদ আয়াজ বলছেন, আরে বাচ্চা, তোমাদের কাছে কবীর একটা লোক, আমাদের কাছে তিনি এক কুঁয়া। আমরা সেখান থেকে পানি তুলেই যাচ্ছি। নিজেরাই লিখছি গান, আর গানের শেষ চরণে লিখে দিচ্ছি কহে কবীরা। কবীর তো একটা দর্শন আমাদের কাছে। আমরা সবাই কবীর।
এইটা আমাদের উপমহাদেশ। বার্ত যতই বলুন অথর ইজ ডেড। পশ্চিমের ওই দৃষ্টি দিয়ে আমাদের বোঝা যাবে না মশাই৷ আমাদের এখানে অথরের জন্মই নেই, মৃত্যু কীভাবে হবে?
একজন লেখক হিসেবে, আগাপাশতলা গদ্যকার হিসেবে আমার প্রস্তুতি তাহলে কীরকম হবে। আমি নিজেকে প্রস্তুত করব একজন খাঁটি বেশ্যার মতো। তিনি যেমন সারাদিন সাবানে ঘষে, সুগন্ধি আতর মেখে, খোঁপায় ফুল গুঁজে, স্তনরেখা দৃশ্যমান রেখে আঁচল মেলে বসে থাকেন মোড়া নিয়ে দরজার সামনে, প্রস্তুতির দিক থেকে তাঁর সাথে আমার কোনও ফারাকই নেই। তিনি জানেন না, বাবু কখন আসবে। কে আসবে। কেমন হবে সেই লোক। ভদ্র, নম্র, প্রেমিক নাকি অত্যাচারী মারমুখী নাকি টুপভুজঙ্গ মাতাল, তিনি জানেন না। তিনি শুধু নিজেকে সাজিয়ে প্রস্তুত করে রাখেন। এটুকুই তাঁর কাজ। আমিও তাই করি, লেখক হিসেবে।
আমাকে তোমরা নিয়তিবাদী, অদৃষ্টবাদী যা-ই বলো, লেখার জন্য প্রস্তুতির দিক থেকে আমি একজন বেশ্যার সমতুল ছাড়া কিছু নই।
আর লেখা যখন নিজেই লেখে, আমি বসে থাকি, তখন প্ল্যানচেটের মিডিয়ামের মতোই আমার কাজ। হেনরি মিলার এজন্যেই বলতেন, যখন লিখি, আমি তখন আলখাল্লা পরা এক সন্ন্যাসী।
তবে, আসলে কিন্তু আমি এক সাপ; নিজের খোলস যে ছেড়ে যায় নির্মোহভাবে, ফিরেও তাকায় না আর সেদিকে। যেভাবে নিজের নখ কেটে ফেলে দিই, সেলুনে চুল কেটে ফেলে দিই ধূলায়, মাটিতে৷ আশ্চর্য নয়? যে চুলে এত চিরুনি চালালাম যত্নে, সেটাই ফেলে এলাম কী অবলীলায়। ওই নখ, ওই চুল, এসব আমারই, তবু, কেটে ফেলার পর তারা আর আমার নয়। তাঁদের আঁকড়ে ধরে রাখার মায়া আমরা করি না। যেভাবে মায়া রাখে না সাপও, তার পরিত্যক্ত খোলসের প্রতি। একটা রচনার পর, পরের রচনার দিকে এগিয়ে যাওয়া আমি, সেই মায়াহীন নির্মোহ সাপ। তাকাব না কী লিখেছি আগে, কীভাবে লিখেছি, ভুলে যাব সেই স্মৃতি।
একটা লেখার সময় আমি বুঝতে পারি আমি আর লিখছি না। লেখা লিখছে, আমি বসে আছি। সারা দিনে, রাতে, যে-কোনও সময়, যে-কোনও জায়গায়, কাগজের ওপর কলম খুলে বসলেই শব্দসমূহ এসে যাচ্ছে, এবং গড়ে উঠছে বাক্য। আমার সমগ্র আমি যেন জমাট রক্তের মতো জড়ো ও ঘনসন্নিবদ্ধ হয়ে বসেছে আমার তর্জনীতে। আমি বসে আছি আমার আঙুলের ডগায়। লেখা এখন আমার ঘাড়ে। আমি তাঁর অনুগতজন। যিনি লেখেন তিনি মারাং বুরু। এ এক অপূর্ব সময়, অন্ধ পিয়ানোবাদক যখন নিজেকে সম্পূর্ণ তুলে দিয়েছেন শাদা-কালো রিডের ওপর সচল তাঁর আঙুলগুলোর মধ্যে; লোকটা আছে, তাকে সবাই দেখছে, কিন্তু সে নেই আসলে।
আলাদা করে কল্পনা শব্দে আমার বিশ্বাস নেই। এতক্ষণ যা বললাম এ কি কল্পনা? নাকি এটাই রিয়েলিটি? যা আমি কল্পনা করি তা-ই বাস্তব। আবার এও সত্য যে, আমার সমস্ত লেখাই একটা বেসিক রিয়েলিটির জায়গা থেকে উঠে আসে। পরে আমি হয়ত সেই লেখা থেকে রিয়েলিটির চিহ্নগুলো ব্লার করে দিই, যাতে লেখাটা সুনির্দিষ্ট কোনও খোপে না পড়ে যায়।
১১) বর্তমান সময়ে আপনার কার কার গল্প ভালো লাগছে?
ভালো লিখছেন হয়ত অনেকেই, কিন্তু আমার সময়ে জীবিত কোনও গদ্যকারকে আমি দেখছি না, যাঁর থেকে ভাষাটা শিখতে পারি। ঈর্ষা করতে পারি যাঁকে। এঁদের অনেকের মাথায় একেকটা সোশ্যাল বা/ও পলিটিক্যাল এজেন্ডা আছে। পূর্ব নির্ধারিত কিছু উদ্দেশ্য আছে। পারপাস। সেই উদ্দেশ্যগুলো হয়ত ভালো, কিন্তু যেটা বলার, সেটা হল, আর্ট ইজ বিউটিফুল বিকজ ইট ইজ ইউজলেস। শিল্প অহৈতুকী কাজ। অকারণে ঘটে। এঁরা মনে হয় না সেটা বিশ্বাস করেন।
১২) আপনার একটি অন্যতম প্রিয় গল্পের অনুষঙ্গ বা উৎস বলুন। (সম্ভব হলে সারাংশ সহ।)
আমার প্রতিটি গল্পেরই কোনও না কোনও বাস্তব ভিত্তি আছে। আকাশ থেকে হঠাৎ একদিন সেগুলো নেমে আসেনি। নেমে আসে না। সেই বাস্তবতার চিহ্নগুলো আমি আবছা করে দিই বলে সেগুলোকে নির্দিষ্টভাবে চেনা যায় না। আলাদা করে প্রিয় গল্প নয়, আমি বরং একটা চরিত্রের কথা বলি। যেমন পা কাটা জামাল। দু পা যার হাঁটুর নীচ থেকে কাটা এবং যে ক্রাচ ছাড়াই হেঁটে যায় এবং তার হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে তার অদৃশ্য পায়ের সাথে তার চটিজোড়াও চলতে থাকে। পা-টা যেন আছে, দেখা যাচ্ছে না, এই যা। এই চরিত্রটি সেক্স অ্যান্ড ফিলোসফিতে আছে। একে নিয়ে আমি গল্পও লিখেছি। আমার নতুন উপন্যাস, দুপুরে সন্ধ্যার মেঘ-এও এই চরিত্রটি আছে। একে আমি পেয়েছি নিজেকে দেখে। দু হাজার একুশ সালে আমার এক্সট্রা পালমোনারি টিউবারকিউলোসিস হয়। কিন্তু চিকিৎসা শুরু হতে অনেক দেরি হয়ে যায় বলে আমার দু পা হাঁটুর নীচ থেকে এখন অনেকটাই সাড়হীন। একে পলিনিউরোপ্যাথি বলে। এই আমি পেলাম পা কাটা জামালকে। আমার এই রোগ না হলে কি তৈরি হত এই চরিত্র?
১৩) আপনার গল্পে কি আত্মজীবনীর অংশ চলে আসে? বা এই চলে আসাটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
আসে তো অবশ্যই। এই চলে আসাটা জলের ওপর প্রতিবিম্বের মতো, যেখানে দুজনেরই দু-দিকের জগৎকে রহস্যময় লাগে। আবার চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে ধাবমান তার ছায়ার মতোই তারা এক ও আলাদা। কামুর ‘বহিরাগত’ উপন্যাসের মসো চরিত্রের মতো উদাসীনতা এবং নির্লিপ্তি নিয়ে আমরা আমাদেরকেই দেখছি—বেড়ালের হাসিও আমরাই, বেড়ালের মুখে ধরা ইঁদুরের শেষ মুহূর্তের জীবনতৃষ্ণাও আমরাই।
১৪) গল্পের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে আপনার কাছে? বা কোনো আকার আয়তন? অনুগল্প লিখেছেন কখনো বা ‘অনুগল্প’- এই শব্দবন্ধটিতে আপনার আস্থা বা বিশ্বাস আছে?
না কোনও সংজ্ঞা নেই। ছাঁচ নেই। আকার, আয়তনের ব্যাপার তো নেই-ই। আর অণুগল্প বলে কিছু হয়, এরকম বিশ্বাস আমার নেই। কিন্তু কেন অণুগল্প বলে কিছু হয় না, সে প্রশ্নটি রাজনৈতিক। ফলে তার উত্তরও রাজনৈতিকই হবে। যে যুক্তিতে অস্ট্রিয়ার লেখক থমাস বার্নহার্ড ওঁর অদ্ভুত খুদে গদ্য-গল্পগুলোকে শর্ট স্টোরিজ বলেন, যে যুক্তিতে স্যামুয়েল বেকেট ওঁর সবচেয়ে দুর্বোধ্য উপন্যাস হাউ ইট ইজ-এর নাম রাখেন হাউ ইট ইজ : আ নভেল। যে যুক্তিতে কাফকা কিংবা বনফুল, কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন ওঁদের খুদে রচনাগুলোকে গল্প কিংবা ছোটগল্পই বলছেন, অন্য নাম তো দিচ্ছেন না। এটাকে আমার একটা সচেতন রাজনৈতিক অবস্থান বলেই মনে হয়।
অণুগল্প, না-গল্প, এরকম নাম ব্যবহার একটা পলিটিক্যাল ব্লান্ডার। যখনই আমি এরকম অন্য একটা নাম দেব, বা নামহীন রাখব, আমি নিজেকে ‘আদার’-এ নিয়ে রাখব তখন। ব্র্যাকেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ব্র্যাকেট নিয়ে কথা বলা যায় না। গল্প, উপন্যাস সম্পর্কে বাজার বা সিস্টেমের ঠিক করে দেওয়া ধারণা ও ছাঁচকে আর আক্রমণের সুযোগ থাকে না তখন। লুই ফার্দিনান্দ সিলিনের জার্নি টু দ্য এন্ড অফ দ্য নাইট বা জাঁ জেনের আওয়ার লেডি অফ দ্য ফ্লাওয়ার্স বা হেনরি মিলারের আত্মজৈবনিক লেখাগুলো কিম্বা তিরিশ-চল্লিশের দশকে লেখা জীবনানন্দের উপন্যাসগুলোও কি বাজারের ধারণা অনুযায়ী উপন্যাস শ্রেণিভুক্ত হয়? তবু তাঁরা সেগুলোকে উপন্যাসই বলছেন। বলিউডি হিরোর মতো হাত ছড়িয়ে গান গাওয়াটাই যে একমাত্র অভিনয় নয়, সেটার বাইরে অন্য অভিনয়টা করতে গিয়ে যে কাজগুলো করা হয়েছে/হচ্ছে ও হবে, সেগুলোকেও সিনেমাই বলা হচ্ছে।
বর্ডারের বাইরে গিয়ে বর্ডারের ভেতরটাকে সমালোচনা, কাউন্টার, অ্যাটাক কিছুই করা যায় না। যখনই আমি বলব ইহা পরীক্ষামূলক, নিরীক্ষাধর্মী গল্প, তখনই সাধারণ মানসে গল্পের যে যৌথ ধারণা তৈরি করা হয়েছে, তা নিয়ে কিছু বলার, তাকে প্রশ্ন করার অধিকার হারাব আমি।
বাজার সর্বদা একটা গড় মানসিকতা তৈরি করে। যখন এই তথাকথিত ‘অন্য’ গল্পগুলোকে সোজাসাপ্টা গল্প বলেই দেগে দিতে পারব আমরা, তখন বাজার প্রকৃতই বিচলিত হবে। কারণ তখনই, এতদিন যা বাজারের বাইরে ছিল তা বাজারের ভেতরে এসে আসন পেতে নটে শাক নিয়ে বসেছে। আমি এটাকে রাজনৈতিক অবস্থান বলেই মনে করি। সোজা কথা, হয় তুমি আলাদা ভূখণ্ড নিয়ে (পড়ুন ক্যাটাগরি) আজাদি নাও, অথবা ভেতরের তৈরি করা ক্যাটাগরিকে ঘেঁটে দাও। আমি দ্বিতীয়টাকে ঠিক মনে করি। এক্ষেত্রে। জাস্ট ঘেঁটে দাও৷ ওই অন্তর্ঘাতটাই জরুরি। সকল নিয়ে সর্বনাশের আশায় বসে আছে অভ্যস্ত প্রথাগত বর্গীকৃত শিল্পধারণা; ভেতর থেকে ভেঙে তাকে কাঙ্ক্ষিত মোক্ষ দাও।
তুমি যখন শপিং মলের বাইরে ফুটপাথে ঝুড়িতে শাকের আঁটি নিয়ে বসবে, আর নিজের পসরার নাম দেবে মুক্তমল বা না-মল, তখন শপিং মল নামক ব্যবস্থা ও বাজার তোমাকে নিয়ে মোটেও চিন্তিত হবে না। কারণ তুমি তো তার সীমানার বাইরে নিজের অবস্থান রাখছ। এবারে এই তুমিই যখন ওই শাকের আঁটি নিয়ে লুঙ্গির কষি বেঁধে শপিং মলের ভেতরে মেঝেতে বসে পড়বে, তাদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে যাবে। তোমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাবে সিস্টেম। কারণ তুমি যেটা ঘটিয়েছ, শাদা বাংলায় সেটা আক্রমণ।
১৫) কবিরা প্রায়ই দাবি করেন তারা অনেক সময়ই হঠাৎই একটা লাইন পেয়ে যান, যা দৈব প্রেরিত এবং আকস্মিক। তারপর তারা বাকি লাইনগুলো লিখে ফেলেন। আপনার ক্ষেত্রে গল্পের প্লট কিভাবে আসে?
বিমান উড়ানের আগে থাকে রানওয়ে পর্ব, যেখানে তাকে নিজের গতি সঞ্চয় করতে হয়। আমার সমস্ত গল্পের ভাবনাই উঠে আসে বাস্তব কোনও ঘটনার প্রেক্ষিতে। সেটা হতে পারে কোনও কবিতার লাইন আমি পড়লাম (যেমন চেসোয়াভ মিউশের কবিতার লাইন, ‘বিনাশের সময় পান করা এক গেলাস ভদকা’), সেখান থেকে উঠে এল একটা গল্প। অথবা কিছু দেখে একটা গল্পের ভাবনা আমার মাথায় এল। এরপর সেই ভাবনা বা লেখাটির সঙ্গে দড়ি টানাটানি চলে বেশ কিছুদিন। তারপর হঠাৎ একদিন লেখাটা শুরু হয়ে যায় সমস্ত শেকল ছিঁড়ে। ‘সুভাষিণীর মৃত্যু বিবরণ’ গল্পের ভাবনাটা কীভাবে এসছিল বললে এটা পরিষ্কার হবে। নগরের গৃহহীনদের জন্য সরকারি আশ্রয়ে তখন থাকি। একদিন রাতের দিকে একজন প্রবীণা সেখানে এলেন। এক রাতই তিনি ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলারও সুযোগ আমার হয়নি। আমি শুধু বিভিন্ন জনের কথোপকথন থেকে শুনেছিলাম, তাঁর নাম সুভাষিণী। ব্যস, আমার গল্পটা এখান থেকে তৈরি হয়ে গেল। অথচ ওই গল্পের সঙ্গে এই ঘটনার কোনও মিলই নেই, নামটুকু ছাড়া। এখানে দৈব-টৈব কিছু নেই। যা আছে, তা, অল্প কল্পনাশক্তি আর প্রচুর পরিশ্রম।
১৬) গড়পরতা পাঠকের কাছে আপনার ভাষায় কাঠিন্য ধরা পড়ে, আপনি মানবেন সে কথা?
এটা আমি জানি, একজন মেধাবী পাঠকই পারেন কোনও লেখাকে পুনর্জীবিত করতে, তাকে এক্সটেনশন দিতে৷ এবং যখন তিনি এটা করেন, তিনি হয়ে ওঠেন সেই লেখার সহলেখক। তাই, আমার পাঠক আমার ক্লায়েন্ট বা খদ্দের নন৷ তিনি আমার কমরেড। তাঁর সাথে আমার যে সম্পর্ক, তা ফ্রেটার্নিটির। আমরা একেকটা রচনার সহলেখক। আমার লেখকসত্তা তাঁর চেয়ে কোনও অর্থেই হায়ারার্কিতে থাকতে পারে না। আমিও দাঁড়িয়ে আছি আমার পাঠকের সাথে এক কাতারে। এক আসনে৷
কোনও কিছুই এখানে মসৃণ নয়। নিরাপত্তাবেষ্টনী একটা মিথ্যে কথা, যা অবাস্তব এবং প্রতারণা। ফলে, আমার গল্প, উপন্যাসের রৈখিক বাস্তবতা ভেঙে চুরমার হবে; আক্রান্ত হবে এর আখ্যানের নিরাপত্তা। তাসের ঘরের মতো ঝুরঝুর করে ভাঙবে আমার গল্প, ন্যারেটিভ। এমনকি আচমকা থেমেও যাবে। হারিয়ে যাবে। যাবেই৷
১৭) লেখা শুরু হবার পর ভাষা গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়, না লেখাই ভাষার যোগান দেয়?
লেখাই যোগাড় করে, বিষাদ ও বিভূতি, তার যা প্রয়োজন।
১৮) একবিংশ শতকের পৃথিবীতে আমরা এখন একটা ভার্চুয়াল জগতেও বাস করি। আমাদের এই ভার্চুয়াল জগৎ, সোশ্যাল মিডিয়ার জগৎ, আপনার গল্পের ক্ষেত্রে কি কোনো প্রভাব ফেলছে? সঙ্গে আর একটু যোগ করছি– বিশ্বায়ন ও বিজ্ঞাপনের পৃথিবীকে মোকাবেলা করার জন্য ২১ শতকের বাংলা গল্প কি তৈরি? না, মোকাবিলা করতেই হবে এই কথাটাতেই আপনার বিশ্বাস নেই?
আমার অনেক গল্প, উপন্যাসের অংশ আমি পেয়েছি মেসেঞ্জারে কারুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে। চায়ের দোকানে যেভাবে আড়ি পেতে বসে থাকি, ফেসবুকেও অন্যদের পোস্টে নানারকম মন্তব্য থেকে আমি লেখার উপাদান পাই।
শিল্পের ওভাবে সরাসরি মোকাবিলার দায় নেই। শিল্প পারপ্লেক্সিটির কথা বলে। এটা অনেক বেশি অবস্কিওর। অন্তত সংবাদপত্রর থেকে তো বেশিই। এটা সার্টেইনিটির কথা বলে না। এটা লুসিড নয়। এটা অকারণে তৈরি হয়, এটা অহৈতুকী। এখানে বোঝা যায় আমরা আমাদের বাস্তবতা সম্বন্ধে কিছুই জানি না অথবা সবচে’ কম জানি। তুমি হয়ত বলতে চেয়েছ, বিশ্বায়ন এবং বিজ্ঞাপনের পৃথিবীতে যথার্থ ভাষা কি বাংলা গল্প ধারণ করেছে? এটাও একটু জটিল বিষয়। কোনও এক কালখণ্ডে দাঁড়িয়ে কোনও সাহিত্য কোন ভাষায় সৃষ্টি হবে, যেমন ধরো অমিয়ভূষণের মধু সাধু খাঁ, কিম্বা কমলকুমারের সুহাসিনীর পমেটম, এর ভাষাটা তো বাইরে থেকে কেউ ঠিক করে দিতে পারে না। এমনকি লেখকও পারেন না অনেকক্ষেত্রে।
১৯) কিছু বছর থেকে সমস্ত শিল্পেই লোকজ উপাদানকে বেশি বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আপনার গল্পের ক্ষেত্রে কি আপনার সেই রকম সচেতন কোন প্রয়াস আছে?
ওভাবে আগে থেকে ভেবে লেখার কাজ করা যায় নাকি? আমার ‘সেক্স অ্যান্ড ফিলোসফি’ উপন্যাসে বৃদ্ধ শিল্পী যখন শিবলিঙ্গের প্রসঙ্গে বলেন, সেটা তো একরকমের লৌকিক উপাদানই। কিন্তু আগে থেকে ভেবে, চলো এবার লোকজ উপাদান বেশি করে দেব। কিম্বা চলো একুশ শতককে মোকাবিলা করি, এভাবে হয় না। শিল্প কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়।
২০) একটি গল্প লেখার আগে কি আপনি রিসার্চ করায় বিশ্বাস করেন?
একটা গল্প বা উপন্যাস লেখার জন্য গ্রামেগঞ্জে ঘুরে, বিভিন্ন জনজাতির সঙ্গে মিশে, তারপর ফিরে এসে প্রচুর বইপত্র ঘেঁটে যে লেখা, সে লেখা আমার জন্য নয়।
উপন্যাসে, গল্পে, আমি সবসময় লিখতে চেয়েছি, আমার বাস্তবতা, যেটা সম্পর্কে আমি সবচেয়ে কম জানি অথবা কিছুই জানি না। আমার নিজের এবং আমার বাস্তবতার ভেতরে খোঁদল করতে করতে আমাকে ঢুকতেই হত এই গহ্বরে, যেটা অনেকটা একটা আদিম গুহা বা সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ার মতোই, যেখানে ঢোকার পর কী হবে তা আমি কখনওই আগে থেকে জানি না, এর কোনও পূর্বানুমান নেই। হ্যাঁ, বিষয়টা একই সঙ্গে উত্তেজনার এবং একই সঙ্গে বিষণ্ণতার, চমকপ্রদ এবং একঘেয়ে, একইসঙ্গে। একটা গল্প কিম্বা উপন্যাস লেখার সময় আমি জানি না সেই জগৎ কী করে আমার কাছে আসছে, বা এসবের মধ্যে দিয়ে সে আসলে কী বলতে চাইছে। ব্যাপারটা কবিতা লেখার মতোই অনেকখানি, যখন কবি জানেন না পরের লাইনে তিনি কী লিখবেন। আমার বরাবরের যেটা স্বভাব, ক্ষেত্র নয়, আত্মসমীক্ষা। বাংলা সাহিত্যের পারিবারিক সদস্যদের ধারা মেনে অনেক বন-জঙ্গল-নদী-পর্বত-গ্রাম-আদিম জনজাতিদের মধ্যে ঘুরে অথবা নস্টালজিয়া খোঁড়াখুঁড়ি করে বিস্তর গবেষণা সন্দর্ভের মতো উপন্যাস উৎপাদন, এসব বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, আমার নয়। এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। আমাকে রিসার্চ চালাতে হয় নিজের ভেতরে। খোঁড়াখুঁড়ি যা কিছু নিজের বাস্তবতার জঙ্গলে। আটটি উপন্যাস এভাবেই। পঞ্চাশটি গল্প অন্ততঃ, এ পথেই। আখ্যানটি বলার জন্য আমার কোনও রীতি নেই৷ প্রত্যেকটির জন্য প্রয়োজনীয় গদ্যশৈলী খুঁজতে আমাকে বসে থাকতে হয়, হাতড়াতে হয়, অন্ধকারে। এছাড়া কোনও উপায় আমার জানা নেই। পুরোটা লেখার সময়কালে, লেখাটার সঙ্গে আমার এত ধ্বস্তাধস্তি চলে যে, আমি ক্লান্ত বিধ্বস্ত, নিঃশেষিত হয়ে যাই পুরো। সম্পূর্ণ ছিবড়ে। তারপর আবার নিজেকে তুলে আরেকটা আখ্যানের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এবং ফের একইরকম ধ্বস্তাধস্তি, শরীর-মন-মাথার ভেতর দিয়ে অসম্ভব ঝড়, বয়ে যায়। এই যুদ্ধটা প্রচণ্ড অবসাদগ্রস্ত করে তোলে নিজেকে। সংশয়ে কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত অবস্থা। তখন মনে হয়, সত্যিই মনে হয়, আর নয়। আমার তো নিজেকে, নিজের মনকে ভালো রাখারও দায়িত্ব রয়েছে। লিখছি কেন তবে? লিখনে কী ঘটে?
২১) আপনার গল্পে যৌনতা কিভাবে আসে? আপনার গল্প ছাড়াও অন্যান্য এই সময়ের গল্পে যে যৌনতা আসছে তা কি আগের মতোই আসছে, না কি, এই যৌনতার প্রকাশ অনেক বদলে যাচ্ছে শব্দে অক্ষরে বা অন্য কিছুতে?
স্বাভাবিকভাবেই আসে, আর পাঁচটা জিনিসের মতো।
এখন আমরা এমন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে যৌনতার যে সৌন্দর্য এবং বিষাদ, তা দেখা যায় না। বরং যৌনতার প্রকাশের মধ্যে দিয়ে দেখানো হয়, যে দ্যাখো আমরা কত আধুনিক হয়েছি। বাস্তবে কিন্তু তা নয়। এখানে পুরো সিস্টেমে শালা পচে দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে; সৌন্দর্য, বিষাদ— এসবকে বোঝার মতো নির্জনতা এখানে কোথায়! নির্জনতা একটি ধর্ম। একটি মন যত শক্তিশালী, সে তত বেশি এই ধর্মের দিকে ঝুঁকবে।
২২) কোন শব্দই অচ্ছুত নয়। তবু ‘স্ল্যাং ল্যাঙ্গুয়েজ’ বলেও একটি কথা রয়েছে এখনো চালু রয়েছে। আপনার গল্পের চরিত্রদের পারস্পরিক কথোপকথনের ক্ষেত্রে বা আপনি নিজে বিষয়টাকে কিভাবে দেখেন?
স্ল্যাং আবার কী! অক্ষর শব্দের অর্থ, ক্ষরিত বা নষ্ট হয় না যা। হেনরি মিলার তো বলতেন, অশ্লীলতা হল পরিচ্ছন্নতার আরেক নাম। আমার চরিত্রদের পারস্পরিক কথোপকনে এরকম শব্দ প্রয়োজন হলে থাকে। অসুবিধে কী? আমি কোনও নীতি-নৈতিকতার দায় মাথায় নিয়ে লিখতে বসিনি যে আমাকে আগে দশবার পরে পনেরোবার ভাবতে হবে। লেখা কী চাইছে, এটাই আমার কাছে শেষ কথা।
সমস্যাটা অন্য ক্ষেত্রে। মিলারের সময়টা তবু অনেক স্বচ্ছ ছিল। তখন লড়াই হত সামনাসামনি। রাষ্ট্র নিষিদ্ধ করে দিত তাঁর বই। তারপর মিলারের উপন্যাস ফ্রান্সে ছাপা হয়ে আমেরিকায় পাচার হত। কীভাবে হত? ফরাসি রান্নার বইয়ের মলাটে ঢেকে ফ্রান্স থেকে আমেরিকায় আসত মিলারের বই। ওপরে ফরাসি রান্নার বইয়ের কভার। ভেতরে ইংরিজিতে মিলারের উপন্যাস। আমেরিকানগুলো বেশিরভাগই চিরকাল রামপাঁঠা। ওরা বুঝতেও পারত না, ভাবতও না যে, হঠাৎ এত ফরাসি রান্নার বইয়ের চাহিদা এখানে বেড়ে গেল কীভাবে। কিন্তু লড়াইটা তখন ছিল অনেক প্রত্যক্ষ। এখন ওরা নেই এমনটা কিন্তু নয়। এখন ওদের উইনচিটারের রং বদলে গেছে। ওরা নেই বললেই ওরা চলে যাবে না। এখন ওদের ধরনও একেবারে পালটে গেছে। এখন মিলারের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে ঠিকই। কিন্তু সাহিত্য ও শিল্পের মননাশ্রয়ী লোকেদের মনের নিষেধাজ্ঞা কে ওঠাবে? এখন মহান সম্পাদক মিলারকে নিয়ে ঢাউস সংখ্যা ছাপেন। আর চুপিচুপি পালটে দেন উপন্যাসের শব্দ। কেউ জানতেই পারে না কোথা হইতে কী হইয়া গেল। এটাই হল আসল অশ্লীলতা। এটাই অশ্লীলতা। নাহ্, এটা বোধহয় অশ্লীলতা নয়। অশ্লীলতা তো পরিচ্ছন্নতার আরেক নাম। এটা তো নোংরামি। নোংরা ব্যবসা। পর্নোর মতো।
২৩) আপনার বেশিরভাগ চরিত্রই প্রান্তিক চরিত্র। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র থেকে তারা অনেক দূরে। আপনি কি নিজে এই প্রান্তিকতার আড়াল বেছে নিয়েছেন ক্ষমতাকে আক্রমণ করবেন বলে? আপনার গল্পে আপনার চরিত্ররা বা কথোয়াল হিসাবে আপনি নিজে কিভাবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেন?
একমাত্র ভদ্রবিত্তই তার সমাজের বাইরের মানুষকে প্রান্তিক বলে দাগায়। আমার চরিত্ররা আমার মতোই সমাজের মধ্যে থেকেও এর বাইরে রয়েছেন, যাঁরা এই সমাজের সঙ্গে সহবাস করেন না। তাঁরাই আমাকে বেছে নিয়েছেন। আমিই তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠেছি।
দ্যাখো, মানুষের মনের ইতিহাস আছে—দীর্ঘ এবং কষ্টকর ইতিহাস। অন্য সব মানব অঙ্গের মতো এটিও অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত ট্রায়াল অ্যান্ড এররের অনিশ্চয়তার মধ্যে তার পথ তৈরি করেছে। আমাদের সব বর্তমান ক্ষমতা অতীত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আমরা কেউ হঠাৎ একদিন আকাশ থেকে পড়িনি। আমাদের অবস্থান আমাদের চেতনাকে নির্ধারণ করে। চেতনা কখনও অবস্থানকে নয়। এবং এখানে কোনও আড়াল নেই। গণতন্ত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা যেমন শাসকের সিংহাসন শক্ত করে, তেমনিই সেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতাই তাকে বাস্তবতা থেকে দূরে নিয়ে যায়। শাসকের চারপাশে তখন ঘুরে বেড়ায় একদল মানুষ যাদের কাজই হল ওই লোকটাকে বাস্তবতা থেকে দূরে রাখা। এবং মানুষটি তখন বুঝতেই পারবে না তার চারপাশে থাকা এই লোকগুলোর মধ্যে কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যে। ক্ষমতা যত নিরঙ্কুশ হবে, যেকোনও ক্ষমতা, তার সাথে বাস্তবতার যোগ ততই ছিন্ন হবে। এটাই ক্ষমতার ট্র্যাজেডি। অ্যাবসোলিউট পাওয়ারের সঙ্গে তাই বাস্তবতার ঋণাত্মক সম্পর্ক। সিংহাসনে বসে বসে সে তখন সিংহাসন হয়ে গেছে। শিল্পের কাজ তো উত্তর দেওয়া বা সমাধান দেওয়া নয়। শিল্পের কাজ নয় সর্বদা কিছু বার্তা দেওয়া। শিল্পের কাজ প্রশ্ন তোলা। আমার চরিত্ররা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবেই। আমের ভেতরে বসে থাকা পোকা কি আমগাছের পাতা, ডাল, কাণ্ড, শেকড় সম্পর্কে কোনও ধারণা রাখে? সমাজ ও ব্যবস্থার বাইরে থেকে সমাজের ভেতরটাকে আমার চরিত্ররা ভালো করে দেখতে পায়।
২৪) আপনার গল্প অনেক পাঠকের কাছে কবিতার মতো লাগে। প্রথমে বলুন আপনি এই কথাটাকেই মানেন কিনা। তারপর বলুন যদি আপনারও তাই মনে হয়, এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? প্রশংসা না নিন্দা? আপনি তো আল্টিমেটলি একটা গল্পই লিখতে চাইছেন।
আমার কিছু গল্প সম্পর্কে এই কথাটা হয়তো খাটে। অন্তত ‘ডি মেজর’ বইয়ের কিছু গল্পের ক্ষেত্রে। আমি একে প্রশংসা বলেই দেখব। কারণ যেকোনও শিল্পের অন্তিম গন্তব্য, কবিতা হয়ে ওঠা। একটা সিনেমা দেখে যদি তোমার মনে হয় এটা একটা কবিতার মতো কিছু দেখলাম, সেটা তো প্রশংসাই।
২৫) ল্যাপটপে, ট্যাবে বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোবাইল ফোনে চলে যাচ্ছে আমাদের পড়াশোনা। বাড়ছে অনেক বেশি ই-ম্যাগের সংখ্যা। এইসব ক্ষেত্রে বিশেষ করে মোবাইলে একটা গল্প পড়ার বাস্তব অসুবিধাও রয়েছে কিছু। আপনার কি মনে হয় এই বিষয়টার জন্য গল্পের পাঠক কমে যাচ্ছে? বা এই বিষয়টা আদৌ কোন প্রভাব ফেলছে গল্পের পাঠক সংখ্যাতে? প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে আপনি কিভাবে দেখছেন? আর একটা কথা গল্পের পাঠক সংখ্যা আপনাকে সত্যিই কি ভাবায়?
পাঠক সংখ্যা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। বেশি পাঠক হয়ে গেলে সমস্যা হয় আমার। আমার দশ-বারোজন পাঠকই ভালো। একশোজন পাঠক হলে আমি নিজেকে সন্দেহ করব। অঁরি মিশোও এরকমই একটা কথা বলেছিলেন লোকনাথ ভট্টাচার্যকে। অঁরি মিশোর কথায়, একজন লেখকের পাঁচশোর মতো পাঠক থাকাটাই যথেষ্ট। প্রয়োজনের বেশিই বলা যায়। তারপর নিজেই বলেন, একটা ডবল ডেকার বাসে কজন যাত্রী ধরে। যতজন ধরে ততজনই যথেষ্ট। তারপর বললেন, একজন সৎ পাঠক পেলেই লেখকের চলে যায়। অবশ্য সেই একজন পাঠক লেখক নিজেও হতে পারেন, অঁরি মিশো বলেন লোকনাথ ভট্টাচার্যকে।
২৬) এটা জিজ্ঞাসা করব না, আপনি কি কি পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি আপনি অনেক বড় পুরস্কারও পাওয়ার উপযুক্ত। পুরস্কারের ক্ষেত্রে লবিবাজি, রাজনীতি –এসব আছে বা নেই– বা এই সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাই।
‘… সেই নৌকো পুড়িয়ে দাও—যা শুধু ওপারে নিয়ে যায়।… বরং সেখানে চলে যাও যেখানে জীবিত ও মৃত সম-আদরে গৃহীত হয়।’ কমল চক্রবর্তীকে লেখা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের চিঠির একটা অংশ ছিল এরকম।
বিশ্বাস এক বড্ড গোলমেলে শব্দ এবং বিপজ্জনক ক্রিয়াপদ। একপ্রকার অন্ধত্বই তার দাবি। কিন্তু যখন এই শব্দটির আগে ‘অন্তিম’ শব্দটি বসে, তখন সেই অন্ধত্বের পায়ে আমার দুঃখদিনের রক্তকমল রাখা হোক। ‘একজন লেখক শুধুমাত্র সেইসব অর্থবহতার প্রতিই তাঁর অন্তিম বিশ্বাস রাখতে পারেন যা তাঁর লিখিত শব্দ।’ ১৯৬৪ সালে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরদিন তা প্রত্যাখ্যান করে সুইডিশ প্রেস-প্রতিনিধির কাছে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সার্ত্র এই বাক্যটি উচ্চারণ করেন।
স্বীকৃতি, পুরস্কার সম্পর্কে এ দেশে এবং অন্য দেশেও অনেকজন নানারকম কথা বলেছেন। তার মধ্যে বেশ কয়েকটা তো, যাকে বলে কোটেবল কোট। সেরা কথাটি বলেছিলেন বোধয়, কালিদাস। মেঘদূতে। ‘যাচঞা মোঘা বরমধিগুণে নাধমে লব্ধকামা’ (মেঘদূত, পূর্বমেঘ, শ্লোক ৬)। ‘গুণীরে অনুনয় বিফলে সেও ভালো, অধমে বর দিলে নিতে নেই।’
অনুষ্ঠান, আনুষ্ঠানিকতা, আলোচনা, সমালোচনা, রিভিউ, প্রচার, বিজ্ঞাপন, বিপণন, সম্মাননা, মানপত্র, উত্তরীয়, পুষ্প স্তবক, পদক, পুরস্কার, গ্র্যান্ট, এককথায় স্বীকৃতি — একজন লেখক হিসেবে এসব আমার কাছে অর্থহীন বললেও কিছুই বলা হয় না। একটা লেখার সামনে একজন লেখকের একা, নিঃসঙ্গ দাঁড়ানোর জন্য এগুলোর কোনওটাই প্রয়োজনীয় নয়। ‘উচ্চারণে আমি একা’। ঠিক একইভাবে, একটি শিল্পকর্ম বা বইয়ের সামনে একজন পাঠক যখন দাঁড়ায়, আমি চাইব, সেও একা, নিঃসঙ্গ হয়েই দাঁড়াবে। কোনও অনুষ্ঠান, আনুষ্ঠানিকতা, আলোচনা, সমালোচনা, রিভিউ, প্রচার, বিজ্ঞাপন, বিপণন, সম্মাননা, মানপত্র, উত্তরীয়, পুষ্প স্তবক, পদক, পুরস্কার, গ্র্যান্ট, এককথায় স্বীকৃতি — তাকে প্রভাবিত করবে না সেই শিল্পকর্ম বা বইটির সামনে মুখোমুখি দাঁড়াতে, একমাত্র তার ওই মুহূর্তের নৈসর্গিক নিঃসঙ্গতা ছাড়া। একজন পাঠক যখন একটা বই হাতে নেবে, সেখানে সে আর ওই বইটি ছাড়া দুজনের মাঝখানে অন্য কিছু নেই। তাদের পাশে বা পেছনেও কেউ নেই। আমার চাওয়ায় পৃথিবীর একটিও চুল বাঁকা না হলেও, আমি এমনটাই চাইব। ঘন গভীর জঙ্গলে একটা বুনো জন্তু বা বন্য জংলি ফুলের দিকে তাকিয়ে যেভাবে একা একটা মানুষ দাঁড়ায়, দাঁড়াতে পারে, সেভাবেই সে কলেজ স্ট্রিট বা বইমেলায় বা এরকমই কোনও বইয়ের দোকানে একটা বইয়ের সামনে দাঁড়াবে। নিজের তথাকথিত ‘আনুষ্ঠানিক সভ্যতা’র ব্লেজার খুলে, পারলে, ন্যাংটো হয়ে। যেভাবে বইটি তার সামনে দাঁড়িয়েছে, ন্যাংটো এবং একা। একজন লেখককে যদি জিগ্যেস করা হয়, আপনি কেন লেখেন, তার একমাত্র সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে, ‘আমি জানি না’। একজন পাঠককে যদি জিগ্যেস করা হয়, আপনি এই বইটি কেন পড়ছেন, তিনিও যেন বলতে পারেন ‘আমি জানি না’। কারণ, এ টেক্সট ইজ এ ফর্ম অফ পার্সোনাল স্যালভেশন।
স্বীকৃতি, পুরস্কার সবসময় লেখক বা শিল্পীই গ্রহণ করেন বা প্রত্যাখ্যান করেন। বা গ্রহণ করার পর সময়মতো তা ফিরিয়েও দেন। শিল্পকর্মটি নিজে এসবের কোনও ধারই ধারে না। সে আদিম, বুনো, জংলি, অসভ্য এবং বর্বর। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছিলেন বা নিয়েছিলেন বলে আমরা ওঁর গানগুলো, সুরগুলো শুনে কাঁদি না। তারা নিজেরাই আমাদের কাঁদায়, আমাদের আত্মত্রাণ ঘটায়, তাই আমরা কাঁদি। নোবেল চুরি হয়ে গেলেও ওই সুর একইরকম ত্রাণক্ষম থাকে। কারণ সে বা জঙ্গলের ওই বুনো বাঘটা এই সভ্যতার, এই আনুষ্ঠানিকতার, এই সার্টিফিকেটের পরোয়া করে না। শিল্পী বা ফরেস্ট রেঞ্জার নিজে করেন কি করেন না দ্যাট ডাজ নট ম্যাটার।
তবে শিল্পবস্তুর না থাকলেও, মানুষের এই সামাজিকতার, এই আনুষ্ঠানিকতার, এই জাগতিকতার প্রয়োজন আছে। ঠিক যেমন তার প্রয়োজন আছে বাড়িতে একটি স্যানিটরি সিস্টেম রাখার। প্রয়োজন আছে বিশুদ্ধ পানীয় জলের। প্রয়োজন জ্ঞানার্জনের। অর্থ উপার্জনের। সম্পর্ক স্থাপনের। আরও কতও কিছুর।
শিল্প হল জঙ্গলের ওই বুনো বাঘ, যার শুধু প্রয়োজন গরম রক্ত আর টাটকা মাংস। বজ্র শিখায় এক পলকে যে শাদায় কালো মিলিয়ে দিচ্ছে, নোবেল কি কয়েৎবেল দুটোই তার কাছে সমান। তুমি তাকে প্রাইজ দিলে কি দিলে না, তাকে তুমি জানলে কি জানলে না, তাতে বাঘটার কী? মানুষ শিল্প-সাহিত্য দেখে-পড়ে-শোনে বলেই শিল্প তার বশবর্তী নয়। জঙ্গলে বা চিড়িয়াখানায় টিকিট কেটে মানুষ বাঘ দেখতে যায় বলে বাঘ কি মানুষের ইচ্ছের তোয়াক্কা করে?
আমিও স্বীকৃতি তথা পুরস্কারের সঙ্গে বৈর সম্পর্ক রাখি না। তবে, পছন্দ করি নিজভৌমে শিবিরসন্নিবেশ। কারণ, মানুষ নিজ ব্যতিরেকে আর কাউকে নিজ অপেক্ষা মহান বলে স্বীকার করে না। আমিও করি না। অন্তত জ্ঞানত। অন্য কাউকে আমাকে পুরস্কৃত করার বা স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারটিকে আমি এই চোখে দেখি যে, আমার ব্লাড কিম্বা স্টুল স্যাম্পল আমি ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়েছি। এবার তারা সেসব শুঁকে, চেটে আমায় পুরস্কৃত করবেন। এ হয় না। লেখা, একজাতীয় বিষ নির্গতকরণ প্রক্রিয়া। না লিখলে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হতে পারে। লেখা, একজাতীয় অন্ধকার নির্গতকরণ প্রক্রিয়া। যা কোথাও আলোর অস্তিত্ব স্বীকার করে।
ছেলেবেলা থেকে পুরস্কার আমি নিজেকে নিজে দিয়ে থাকি। সে অধিকার আমি নিজেকেই নিজে সসম্মানে অর্পণ করেছি। পুরস্কারের প্রয়োজন মানবজীবনে আমি স্বীকার করি। এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস। কিন্তু মুশকিল হল কী পুরস্কার আমি চাইছি, কখন চাইছি, তা অন্য কারুর পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়।
যেকোনও স্বীকৃতি এবং পুরস্কার দেওয়ার মধ্যে যে পলিটিক্স থাকে, যে পাটিগণিত ও আগু-পিছু হিসেব থাকে তার থেকে বহুদূরে বসেও আঁচ পাওয়া যায় ক্ষমতাকেন্দ্রের আগ্রাসী-রাজনীতিটাকে। ক্ষমতা হল সেই বিস্তৃত হাতরূপী জিভ যা নিজের কেন্দ্রের সঙ্গে আরও শাখাজিভ বানিয়ে নেয়। ফলে, যেকোনও কারুর যেকোনও পুরস্কারকে আমি সেই পলিটিক্সের ঊর্ণজালের ট্র্যাপেই দেখব। পুরো ব্যবস্থাটা যেখানে কয়েকশো বা হাজার-দেড়েক পাঠকের একজন লেখককেও ব্যবস্থার দড়ি টানা শক্তির নীচে নিয়ে আসতে চায়।
২৭) একেবারে তরুণ গল্পকারদের আপনার কিছু বলবার আছে?
হ্যাঁ। ব্রেশটের একটা কবিতার চারটে লাইন।
‘তোমাদের জন্য আমি যা করতে পারি
তা হচ্ছে তোমাদের সাবধান করে দেওয়া :
আমাদের পচে-যাওয়া মুখের একটা কথাও তোমরা শুনো না
একটাও পরামর্শ নিয়ো না ব্যর্থ লোকেদের।’

তিতির-এর পক্ষ থেকে অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
বর্ষা—শরৎ ২০২৪
জানুয়ারি ২০২৫, ‘’তিতির’ পত্রিকার গল্প সংখ্যায় প্রকাশিত।
Leave a Reply